১১ অক্টোবর ২০২৬, রবিবার, ০৩:৫৮:১৫ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
ভবন ও শিক্ষক থাকলেও বরগুনার সরকারি প্রাথমিকে তীব্র শিক্ষার্থী সংকট
  • আপডেট করা হয়েছে : ১০-১০-২০২৬
ভবন ও শিক্ষক থাকলেও বরগুনার সরকারি প্রাথমিকে তীব্র শিক্ষার্থী সংকট

দৃষ্টিনন্দন নতুন ভবন, আধুনিক শ্রেণিকক্ষ ও পর্যাপ্ত অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও বরগুনার বহু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মারাত্মক শিক্ষার্থী সংকটে ভুগছে। জেলার বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে পুরো বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা মাত্র দুই থেকে পাঁচজনে নেমে এসেছে; কোথাও আবার দুপুরের আগেই ফাঁকা হয়ে পড়ছে শ্রেণিকক্ষ। পর্যাপ্ত অবকাঠামোর বিপরীতে এমন শূন্যতার পাশাপাশি শিক্ষকদের নিয়মিত উপস্থিতি, পাঠদানের মান ও প্রশাসনিক তদারকি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ক্ষুব্ধ অভিভাবকেরা। এর ফলে সরকারি ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারিয়ে অভিভাবকেরা সন্তানদের কিন্ডারগার্টেন ও মাদ্রাসামুখী করছেন।


বরগুনা সদর উপজেলার মধ্য পাঠাকাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, আধুনিক অবকাঠামো থাকলেও সেখানে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা মাত্র দুজন। পাঁচজন শিক্ষকের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন তিনজন; প্রধান শিক্ষক কিংবা ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক কাউকেই পাওয়া যায়নি। একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা গেছে পার্শ্ববর্তী চড়পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও। সেখানে মাত্র পাঁচজন শিক্ষার্থীর উপস্থিতিতে দুজন শিক্ষিকাকে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়, তবে প্রধান শিক্ষক অনুপস্থিত ছিলেন।


শিক্ষার্থী উপস্থিতি ও দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও চরম অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে। পূর্ব হোসনাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চারজন শিক্ষকের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন দুজন। সেখানে হাজিরা খাতায় চারজনেরই স্বাক্ষর থাকলেও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকাকে একটি খালি শ্রেণিকক্ষে বেঞ্চের ওপর ঘুমিয়ে থাকতে দেখা যায়। অন্যদিকে অপর এক শিক্ষক একই কক্ষে তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির মাত্র পাঁচজন শিক্ষার্থীকে একসঙ্গে বসিয়ে পাঠদান করছিলেন। এছাড়া দুপুর আড়াইটায় উত্তর দেশান্তরকাঠী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কোনো শিক্ষার্থী পাওয়া যায়নি; উপস্থিত ছিলেন মাত্র একজন শিক্ষক। পাশের সর্দারপাড়া হাবিবুর রহমান চানমিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষও ছিল শিক্ষার্থীশূন্য।


সরকারি বিদ্যালয়ের প্রতি অনীহার কারণ হিসেবে অভিভাবকেরা শিক্ষকদের অবহেলা ও দীর্ঘ সময়সূচিকে দায়ী করছেন। শিক্ষার্থী মারুফের মা মরিয়ম ও বাবা সেলিম জানান, সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত দীর্ঘ সময় অবস্থান করতে হলেও সরকারি বিদ্যালয়ে শিশুদের প্রতি যত্ন ও শিক্ষার মান সন্তোষজনক নয়। ফলে বাড়ির কাছে সরকারি স্কুল থাকা সত্ত্বেও বাড়তি খরচ করে কয়েক কিলোমিটার দূরের কিন্ডারগার্টেন কিংবা মাদ্রাসায় সন্তানদের পাঠাতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।


তবে শিক্ষকদের দাবি, এই পরিস্থিতির পেছনে কেবল বিদ্যালয় বা শিক্ষকেরা এককভাবে দায়ী নন। উত্তর দেশান্তরকাঠী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রাজিয়া সুলতানা ও সর্দারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সাইফুল ইসলাম জানান, একই এলাকায় একাধিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা, কিন্ডারগার্টেনে ইংরেজি শিক্ষার ওপর বাড়তি গুরুত্ব এবং অভিভাবকদের মাদ্রাসামুখী প্রবণতার কারণে সরকারি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। এছাড়া মধ্য পাঠাকাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক কামরুন নাহার যোগাযোগব্যবস্থার অনুন্নয়নকে এবং চড়পাড়া স্কুলের সহকারী শিক্ষক মোছা. পারভীন শিক্ষার্থী স্বল্পতায় পাঠদানের আগ্রহ হারানোর বিষয়টিকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।


জেলায় প্রাথমিক শিক্ষার সামগ্রিক পরিসংখ্যানেও এই সংকটের স্পষ্ট প্রভাব দেখা যাচ্ছে। বরগুনায় সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে মোট প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১ হাজার ৪৫টি। এর মধ্যে ৭৯৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী রয়েছে প্রায় ৮১ হাজার ৯০০ জন। এসব সরকারি বিদ্যালয়ে ৫ হাজার ৪৭টি মঞ্জুরিকৃত শিক্ষক পদের মধ্যে ৪৬৪টি পদ বর্তমানে শূন্য রয়েছে।


শেয়ার করুন