২১ জুলাই ২০২৬, মঙ্গলবার, ১১:৪১:৩৪ অপরাহ্ন
মরিয়মের পাসের সন নিয়ে ‘ধোঁয়াশা’
  • আপডেট করা হয়েছে : ২১-০৭-২০২৬
মরিয়মের পাসের সন নিয়ে ‘ধোঁয়াশা’

সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা গাজী নজরুল ইসলামের কথিত দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম আক্তারের (মরিয়ম খাতুন) এসএসসি পরীক্ষার তথ্য, ভাইরাল বায়োডাটা এবং বিয়ের সময়কাল নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে তার ছড়িয়ে পড়া জীবনবৃত্তান্তে শিক্ষাগত যোগ্যতা ও বৈবাহিক অবস্থা সংক্রান্ত তথ্য এমপির দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা প্রশ্ন উঠেছে।


ভাইরাল ভিডিও প্রকাশের পর মরিয়ম এক ভিডিওবার্তায় দাবি করেন, তিনি ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থী এবং এবারই পরীক্ষা দিয়েছেন। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তার কথিত বায়োডাটায় উল্লেখ রয়েছে, তিনি ২০২৬ সালে এসএসসি পাস করেছেন। অথচ চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার ফল এখনো প্রকাশিত হয়নি।


শিক্ষাবোর্ডের পূর্বঘোষণা অনুযায়ী ২০ জুলাই ফল প্রকাশের কথা থাকলেও প্রশাসনিক কারণে তা স্থগিত করা হয়েছে। আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে ফল প্রকাশ হতে পারে। ফলে ফল প্রকাশের আগেই বায়োডাটায় ‘এসএসসি পাস-২০২৬’ উল্লেখ থাকায় সেটি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। যদিও ফলাফলের ঘরে কোনো তথ্য উল্লেখ করা হয়নি।



এদিকে ভাইরাল বায়োডাটায় আরও দেখা যায়, ২০২৬ সালের ২২ জুন সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম সবুজ কালিতে হাতে লিখে ‘জোর সুপারিশ করছি’ মন্তব্যসহ স্বাক্ষর করেছেন। কিন্তু একই বায়োডাটায় মরিয়মের বৈবাহিক অবস্থার ঘরে লেখা রয়েছে ‘অবিবাহিত’।



অন্যদিকে গাজী নজরুল ইসলাম দাবি করেছেন, ২০২৬ সালের ১৭ জুন পারিবারিকভাবে প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে মরিয়মকে দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে বিয়ে করেছেন। সেই হিসেবে বিয়ের মাত্র পাঁচ দিন পরের একটি নথিতে মরিয়মকে অবিবাহিত হিসেবে উল্লেখ করা কেন হয়েছে, তা নিয়েই নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।


সময়ের হিসাবেও আরও একটি অসঙ্গতি সামনে এসেছে। চলতি বছরের এসএসসি লিখিত পরীক্ষা শেষ হয় ২০ মে এবং ব্যবহারিক পরীক্ষা শেষ হয় ১৪ জুন। অর্থাৎ পরীক্ষা শেষ হওয়ার আট দিন পর, ২২ জুনের তারিখে ওই বায়োডাটায় এমপির সুপারিশ দেখা যায়। তবে তখনও এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়নি।


এর আগে ভাইরাল একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে আলোচনায় আসেন সাতক্ষীরা-৪ আসনের এই সংসদ সদস্য। ভিডিওতে থাকা তরুণীকে নিজের দ্বিতীয় স্ত্রী বলে দাবি করেন তিনি। লিখিত বিবৃতিতে জানান, প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে ১৭ জুন মরিয়ম আক্তারকে বিয়ে করেছেন। তার দাবি, মরিয়মের বাবার বাসায় পারিবারিকভাবে এই বিয়ে সম্পন্ন হয়।


তবে বিয়ের দাবির পাশাপাশি ভিডিওটির সময় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ফ্যাক্টচেক প্রতিষ্ঠান দ্য ডিসেন্টের অনুসন্ধানে দাবি করা হয়, ভাইরাল অন্তরঙ্গ সিসিটিভি ফুটেজের টাইমস্ট্যাম্প ২০২৩ সালের জুলাই মাসের। যদি সেটি সঠিক হয়ে থাকে, তাহলে এমপির দাবি করা ২০২৬ সালের বিয়ের সময়ের সঙ্গে ফুটেজের প্রায় তিন বছরের ব্যবধান তৈরি হয়।


এ বিষয়ে গাজী নজরুল ইসলাম দাবি করেন, ভিডিওটি ২০২৬ সালের ১৩ জুলাই ঢাকার মগবাজারের একটি ব্যবসায়িক কার্যালয়ে ধারণ করা হয়েছিল। তার অভিযোগ, ব্যক্তিগত চালক ওবায়দুল্লাহ পরিকল্পিতভাবে কয়েকজনকে নিয়ে সেখানে প্রবেশ করেন এবং পরে সিসিটিভি ফুটেজ ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর ভিডিও ছড়িয়ে দেন। তিনি পুরো ঘটনাকে তার ও পরিবারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র এবং চরিত্রহননের অপচেষ্টা বলে উল্লেখ করেন।


অন্যদিকে মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহও দাবি করেছেন, তার মেয়ের সঙ্গে গাজী নজরুল ইসলামের বিয়ে ১৭ জুন ৩ লাখ টাকা দেনমোহরে সম্পন্ন হয়েছে। তার দাবি, ওই দিনই তাদের অফিসে অবস্থানের সময় ভিডিওটি ধারণ করা হয়।


এদিকে এমপির নির্বাচনী হলফনামা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে জমা দেওয়া হলফনামায় দ্বিতীয় স্ত্রীর কোনো তথ্য উল্লেখ ছিল না। যদিও এ বিষয়ে এখনো কোনো সরকারি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।


সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি কথিত কাবিননামাও ছড়িয়ে পড়েছে। তবে ওই নথির সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। একইভাবে ভাইরাল হওয়া বায়োডাটাটিও আনুষ্ঠানিকভাবে যাচাই হয়নি।


বিষয়টি নিয়ে কালবেলার সঙ্গে কথা বলেছেন সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ও দলটির মিডিয়া বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা মাওলানা আজিজুর রহমান। তিনি বলেন, ‘এমপি সাহেব আমাদের জানিয়েছেন, ভিডিওতে যাকে দেখা যাচ্ছে তিনি তার দ্বিতীয় স্ত্রী। প্রথম স্ত্রীর সম্মতিক্রমেই এ বিয়ে হয়েছে। তবে ভিডিওটি কীভাবে এবং কার মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে, সে বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখছি।’


দ্বিতীয় বিয়ে কবে হয়েছে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিয়ের সুনির্দিষ্ট তারিখ আমার জানা নেই। তবে বেশ কিছুদিন আগে বিয়েটি সম্পন্ন হয়েছে বলে আমরা জেনেছি।’


ভিডিও, বিয়ের তারিখ, এসএসসি পরীক্ষার তথ্য, বায়োডাটা এবং অন্যান্য নথিতে থাকা এসব অসঙ্গতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা চললেও, বিষয়গুলোর সত্যতা নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানা যায়নি। এ বিষয়ে জানতে সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম, তার ‘কথিত’ দ্বিতীয় স্ত্রী ও তাদের স্বজনদের সঙ্গে একাধিকবার চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।


শেয়ার করুন