১৬ জুন ২০২৬, মঙ্গলবার, ০২:২২:৫৪ অপরাহ্ন
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিতে যেভাবে মধ্যস্থতা করল পাকিস্তান
  • আপডেট করা হয়েছে : ১৬-০৬-২০২৬
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিতে যেভাবে মধ্যস্থতা করল পাকিস্তান

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান শান্তি আলোচনার শেষ পর্যায়ে একাধিকবার সমঝোতা ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলেও প্রতিবারই পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির হস্তক্ষেপ করে আলোচনা সচল রাখেন বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। সোমবার (১৫ জুন) জাতীয় পরিষদে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, এই পুরো প্রক্রিয়ায় পাকিস্তান নেপথ্যে থেকে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে।


শেহবাজ শরিফের ভাষ্য অনুযায়ী, আলোচনা যখনই অচলাবস্থার মুখে পড়েছে, তখনই আসিম মুনির সক্রিয়ভাবে যোগাযোগ ও সমন্বয় চালিয়ে গেছেন। তিনি বলেন, যুদ্ধের বিস্তার ঠেকাতে সেনাপ্রধান দিন-রাত কাজ করেছেন এবং হাল ছাড়েননি বলেই শান্তি প্রক্রিয়া টিকে ছিল।


জাতীয় পরিষদে দেওয়া বক্তব্যে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, অনেক সময় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল যখন মনে হচ্ছিল আলোচনা থেমে যাবে। তার মতে, সেই পর্যায়গুলোতে ধারাবাহিক উদ্যোগ অব্যাহত না থাকলে শান্তির সম্ভাবনাও ভেঙে পড়ত।


এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে পর্দার আড়ালে চলা কূটনৈতিক তৎপরতার কিছু দিক প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে আসে। তিন মাসের বেশি সময় ধরে চলা সংঘাত এবং তাতে বিপুল প্রাণহানির প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান কীভাবে মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করেছে, সে সম্পর্কেও এতে ধারণা পাওয়া যায়।


শেহবাজ শরিফ এ সময় উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার, তার কূটনৈতিক দল এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভির ভূয়সী প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে কাতার, সৌদি আরব, তুরস্ক ও চীনের নেতাদেরও মধ্যস্থতামূলক ভূমিকার জন্য ধন্যবাদ জানান। তবে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা নিয়ে বিস্তারিত জানতে চাওয়া হলেও পাকিস্তানের সেনাবাহিনী, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।


সোমবার ভোরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে যুদ্ধবিরতির খবর প্রথম জানান শেহবাজ শরিফ। এর কিছু সময় পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পও নিজের ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে চুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি লেখেন, ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের সঙ্গে চুক্তি এখন সম্পন্ন হয়েছে।’


পাকিস্তানের আয়োজনে আগামী শুক্রবার (১৯ জুন) জেনেভায় এই চুক্তি সই হওয়ার কথা রয়েছে। ইরানের মেহের নিউজ এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, ১৪ দফা সমঝোতা স্মারকের অধীনে যুক্তরাষ্ট্র ৩০ দিনের মধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া এবং দেশটির আশপাশে মোতায়েন বাহিনী সরিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। একই সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়া হরমুজ প্রণালী আবার স্বাভাবিক নৌ চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার কথাও রয়েছে।


ইরানি গণমাধ্যমের তথ্যে আরও বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে স্থগিত থাকা প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের ইরানি সম্পদ ধাপে ধাপে মুক্ত করার বিষয়ে আলোচনা চলছে। পাশাপাশি পরবর্তী ৬০ দিনের আলোচনায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। তবে ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি তেহরানের সমর্থনের বিষয়টি আপাতত এই আলোচনার বাইরে রাখা হয়েছে।


প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এই আলোচনা পরিচালিত হয়েছে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির নেতৃত্বে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলি হামলার প্রথম দিন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর তার ছেলে মোজতবা খামেনি দায়িত্ব নেন। জাতীয় পরিষদে শেহবাজ শরিফ তার নাম উল্লেখ করে বলেন, অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতিতে তিনি ‘অসাধারণ প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা ও ধৈর্যের’ পরিচয় দিয়েছেন।


পাকিস্তানের এই মধ্যস্থতার পথ সহজ ছিল না। গত ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের উদ্যোগে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। তার আগে ট্রাম্পের নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে আসিম মুনির একাধিকবার মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের দাবি, পরে ইসলামাবাদের অনুরোধে ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়িয়ে দেন।


এরপর ১১ ও ১২ এপ্রিল ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের সরাসরি আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৭৯ সালের পর দুই দেশের মধ্যে এটিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ওই আলোচনায় অংশ নিলেও কোনো সমঝোতা ছাড়াই বৈঠক শেষ হয়।


সরাসরি আলোচনা কয়েক সপ্তাহ স্থগিত থাকলেও পাকিস্তানি কর্মকর্তারা ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যোগাযোগ অব্যাহত রাখেন। প্রকাশ্যে বড় ধরনের অগ্রগতির ইঙ্গিত না থাকলেও নেপথ্যে বার্তা আদান-প্রদান চলতে থাকে।


সাবেক পাকিস্তানি কূটনীতিক জওহর সেলিমের মতে, ইসলামাবাদের এই ভূমিকা কেবল কৌশলগত সমন্বয়ের বিষয় ছিল না; এটি ছিল ‘কখনো হাল না ছাড়ার কূটনীতি’র উদাহরণ। তার মূল্যায়নে, উভয় পক্ষের কাছেই গ্রহণযোগ্য সৎ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের গ্রহণযোগ্যতা আস্থার সংকট কাটাতে সহায়তা করেছে।


এই প্রক্রিয়ায় পাকিস্তান একা ছিল না। গত ৩১ মার্চ পাকিস্তান ও চীন যুদ্ধ বন্ধে যৌথ পাঁচ দফা শান্তি পরিকল্পনা ঘোষণা করে। হরমুজ প্রণালী ঘিরে উত্তেজনা এবং জ্বালানি সরবরাহে সম্ভাব্য প্রভাবের কারণে বেইজিংয়ের উদ্বেগও এ উদ্যোগে প্রতিফলিত হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।


মে মাসে পাক সেনাপ্রধান আসিম মুনির দ্বিতীয়বারের মতো তেহরান সফর করেন। তার সঙ্গে ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি। একই সময়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিও একাধিকবার ইসলামাবাদ সফর করে আসিম মুনির ও শেহবাজ শরিফের সঙ্গে বৈঠক করেন। তার এক সফরে তিনি বলেছিলেন, ‘ফলাফল না পাওয়া পর্যন্ত পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে আমরা কাজ চালিয়ে যাব।’


শেষ পর্যায়ে কূটনৈতিক তৎপরতা আরও জোরদার হয়। শনিবার (১৩ জুন) ইসহাক দার সৌদি আরব, তুরস্ক ও মিশরের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন, কারণ তখন আলোচনা পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের ভাষায় ‘চূড়ান্ত পর্যায়ে’ পৌঁছে যায়। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুসারে, সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ পুরো প্রক্রিয়াজুড়ে পাকিস্তানের ধারাবাহিক ও অবিচ্ছিন্ন মধ্যস্থতামূলক প্রচেষ্টার প্রশংসা করেছেন।


একই দিন শেহবাজ শরিফ ঘোষণা দেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি ‘চূড়ান্ত সম্মতিপ্রাপ্ত খসড়ায়’ পৌঁছেছে। তিনি তখন বলেন, ‘শান্তি এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি কাছে।’ তবে ওই সময় ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, চুক্তি সইয়ের জন্য তাদের আলোচক দলের বিদেশ সফরের কোনো পরিকল্পনা নেই। ফলে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অনিশ্চয়তা বজায় ছিল।


রোববার বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে একটি ইসরাইলি হামলার পর তেহরান তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ প্রশ্ন তোলেন, ওয়াশিংটনের আদৌ চুক্তি বাস্তবায়নের সদিচ্ছা বা সক্ষমতা আছে কি না। তবু কূটনৈতিক তৎপরতা থেমে থাকেনি এবং শেষ পর্যন্ত শেহবাজ শরিফের ঘোষণার কিছুক্ষণের মধ্যেই ট্রাম্পও সমঝোতার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।


জাতীয় পরিষদে শেহবাজ শরিফ বলেন, ‘শান্তি প্রক্রিয়ায় অবদানের জন্য পাকিস্তান যে সম্মান ও মর্যাদা অর্জন করেছে, তা অর্জনের চেষ্টা বহু দেশ দশকের পর দশক ধরে করে আসছে।’


শেহবাজ শরিফ বলেন, ‘অনেক সময় মনে হয়েছিল যে আলোচনা থেমে যাবে। কিন্তু সেনাপ্রধান হাল ছাড়েননি। এই যাত্রা যদি অব্যাহত না থাকত, তাহলে শান্তির স্বপ্ন ভেঙে যেত।’


আব্বাস আরাঘচির ভাষ্য ছিল, ‘ফলাফল না পাওয়া পর্যন্ত পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে আমরা কাজ চালিয়ে যাব।’


গত কয়েক মাস ধরে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত, নৌ চলাচল, নিষেধাজ্ঞা, স্থগিত সম্পদ এবং পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। সেই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান, চীন, সৌদি আরব, তুরস্ক ও কাতারসহ একাধিক দেশ নেপথ্যে মধ্যস্থতার উদ্যোগ নেয়। সোমবার শেহবাজ শরিফের বক্তব্যে প্রথমবারের মতো পাকিস্তানের ভূমিকার বেশ কিছু নির্দিষ্ট দিক সামনে আসে।


শেয়ার করুন