০৮ ডিসেম্বর ২০২৩, শুক্রবার, ০৭:৪৯:২২ অপরাহ্ন
পেট্রোবাংলার দায় ৪ হাজার ৩০০ কোটি টাকা
  • আপডেট করা হয়েছে : ১৯-০৬-২০২৩
পেট্রোবাংলার দায় ৪ হাজার ৩০০ কোটি টাকা



পেট্রোবাংলার দায় ৪ হাজার ৩০০ কোটি টাকা

ডলার-সংকটের কারণে গ্যাস খাতের দায় শোধ করতে পারছে না সরকার। শুধু পেট্রোবাংলারই দায় ৪ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। পরিণামে সংকট বাড়ছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে। দায় শোধ করতে না পেরে মন্ত্রণালয় ও পেট্রোবাংলা অনেকটাই অসহায়ত্ব বোধ করছে। জানা যায়, ডলার-সংকটে পড়ে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির বিল শোধের পাশাপাশি দেশের নিজস্ব উৎস থেকে উত্তোলন করা গ্যাসের বিল এবং স্পট মার্কেট থেকে আনা এলএনজির বিলও দিতে পারছে না পেট্রোবাংলা।


গত ১৭ এপ্রিল থেকে ১৭ মে পর্যন্ত এক মাসের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি, স্পট মার্কেট থেকে আমদানি করা এলএনজির বিল এবং এলএনজি টার্মিনালের বিল বাবদ বকেয়া আছে ২২২ দশমিক ৮০ মিলিয়ন ডলার (২ হাজার ৩৮৩ কোটি ৯৬ লাখ টাকা)।


পেট্রোবাংলার বকেয়া বিলের বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘ডলার নিয়ে আমাদের যে ফিন্যান্সিয়াল প্ল্যানিং আছে, সেটা আমরা বিভিন্ন ব্যাংককে অনেক আগে জানিয়ে দিই। তারা ডলার দিচ্ছি দেবে এমন করতে করতে বিল পরিশোধ নিয়ে বেশ কিছু সমস্যা তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন ব্যাংক ঠিকমতো ডলার দিতে না পারায় যে সমস্যাটা তৈরি করেছে, সেটা আমরা জানুয়ারি মাস থেকে বলে আসছি। আমাদের এখন যে ডলার-সংকট আছে, সেটা আমরা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছি।’


জানা যায়, গত বছরের নভেম্বর থেকে চলতি বছরের ২১ মে পর্যন্ত পেট্রোবাংলার কাছে গ্যাস ক্রয় ও উত্তোলন খরচ বাবদ বিদেশি কোম্পানিগুলোর বকেয়া পাওনা ৪১০ দশমিক ৪৭ মিলিয়ন ডলার বা ৪ হাজার ৩৯২ কোটি টাকার বেশি। এই বকেয়া পাওনার মধ্যে একক প্রতিষ্ঠান হিসেবে মার্কিন তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠান শেভরনের বকেয়াই ২ হাজার ৮ কোটি ৬৯ লাখ টাকার বেশি।


দেশের গ্যাস-সংকট নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির অধীনে এবং স্পট মার্কেট থেকে পেট্রোবাংলা এলএনজি আমদানি করে আসছে ২০১৮ সাল থেকে। তীব্র ডলার-সংকটের কারণে বিল পরিশোধ করতে না পারায় গত ১৭ এপ্রিল থেকে ১৭ মে পর্যন্ত এক মাসে ৮টি বিল আটকে গেছে। একই সঙ্গে আটকে গেছে এলএনজিকে বেসরকারি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মধ্যে বাষ্পীভূত করে গ্যাসের জাতীয় গ্রিডে দেওয়ার খরচও।


চলতি বছরের ১৭ এপ্রিল থেকে ১৭ মে এই এক মাসের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি, স্পট মার্কেট থেকে আমদানি করা এলএনজির বিল এবং এলএনজি টার্মিনালের খরচ মিলিয়ে মোট ৯টি বিল বকেয়া পড়ে আছে। এলএনজি খাত বাবদ এই এক মাসে পেট্রোবাংলার কাছে বকেয়া আছে ২২২ দশমিক ৮০ মিলিয়ন ডলার (২ হাজার ৩৮৩ কোটি ৯৬ লাখ টাকা)।


পেট্রোবাংলার কাছে শেভরনের পাওনার বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পেট্রোবাংলা গত বছরের নভেম্বর থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত কোনো পাওনা টাকা পরিশোধ করেনি। ডলার-সংকটের অজুহাত দেখিয়ে এত দিন রাখা গেলেও শেভরন এখন প্রতি মাসে মোট বিলের ৩০ শতাংশ দেওয়ার অনুরোধ করেছে পেট্রোবাংলাকে।


পেট্রোবাংলার এলএনজি সেলের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘শেভরন পেট্রোবাংলাকে অনুরোধ করেছে প্রতি মাসে যে বিল জমা দেওয়া হয়, সেটার কমপক্ষে ৩০ শতাংশ পরিশোধ করতে, যাতে তারা পরিচালন ব্যয়সমূহ বহন করতে পারে।


ডলার-সংকটের কারণে আমরা শেভরনকে গত বছরের নভেম্বর থেকে কোনো টাকা পরিশোধ করতে পারিনি।’


বিবিয়ানা ও জালালাবাদ গ্যাসক্ষেত্র থেকে তেল-গ্যাস উত্তোলনের দায়িত্বে আছে মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানি শেভরন। দেশের মোট সরবরাহ করা ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের মধ্যে ১ হাজার ১৫০ থেকে ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট আসে বিবিয়ানা থেকে। গত নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত বিবিয়ানা থেকে গ্যাস ও কনডেনসেট উত্তোলনের খরচ বাবদ পাঁচটি ইনভয়েসে ১৬৭ দশমিক ২৩ মিলিয়ন ডলারের (১ হাজার ৭৮৯ কোটি ৩৬ লাখ টাকা) বিল জমা দেয়। পেট্রোবাংলা এই পাঁচ মাসে শেভরনকে কোনো বিল পরিশোধ করতে পারেনি।


একই অবস্থা শেভরনের জালালাবাদ গ্যাসক্ষেত্রের বিলেও। নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত শেভরন জালালাবাদ গ্যাসক্ষেত্রের ২২৩ কোটি ৪১ লাখ টাকার পাঁচটি বিল জমা দিয়েছে। পেট্রোবাংলা কোনো টাকাই পরিশোধ করতে পারেনি।


বাংলাদেশে শেভরনের কমিউনিকেশন ম্যানেজার শেখ জাহিদুর রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘পেট্রোবাংলা ডলার-সংকটে পড়ে শেভরনের পাওনা দিতে পারছে না অনেক আগে থেকেই। আমরা পেট্রোবাংলাকে বকেয়ার ব্যাপারে তাগাদা দিয়ে আসছি বারবার। পেট্রোবাংলাও আমাদের বকেয়া কিছু বিল পরিশোধ করছে, তবে ধীরগতিতে।’


জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেন, ‘আমরা এখন বিশ্ববাজারে এলএনজির যে দাম দেখছি, সেটা ৯ ডলারের মতো। এই দাম একসময় ৪০ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল। এলএনজির দাম এত কমানোর পরও কেন পেট্রোবাংলা বিল পরিশোধ করতে পারছে না সেটা বোধগম্য নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘এলএনজির আমদানি বিল পরিশোধ করতে না পারার কারণে সরবরাহকারীরা বাকিতে এলএনজি দিতে অস্বীকার করলে আমাদের রপ্তানি শিল্প ধসে পড়বে।’


ইজাজ হোসেন আরও বলেন, ‘ডলার-সংকট নিয়ে কী হচ্ছে আমরা ঠিকমতো জানি না। সরকারের উচিত ডলারের ব্যাপারে অবস্থান পরিষ্কার করা।’


শেয়ার করুন