০৭ নভেম্বর ২০২৬, শনিবার, ০১:১৩:৫০ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
পুতিনকে চিঠি পাঠিয়ে কী চাইলেন মোজতবা খামেনি, জানা গেল
  • আপডেট করা হয়েছে : ০৭-১১-২০২৬
পুতিনকে চিঠি পাঠিয়ে কী চাইলেন মোজতবা খামেনি, জানা গেল

ইরানকে অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সরবরাহের বিষয়ে রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনা চলছে। তেহরানকে এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দিতে পারে মস্কো। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।




প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ার কাছ থেকে এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পাওয়ার চেষ্টা করছেন। এবার এ বিষয়ে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার বিষয়ে আশাবাদী তেহরান।



ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজাইকে ব্যক্তিগত চিঠি দিয়ে মস্কোয় পাঠান মোজতবা খামেনি। ওই চিঠির মূল দাবি ছিল এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সরবরাহ।



মস্কোয় পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের পর রেজাই বলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক বিষয় নিয়ে পুতিনের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ কথাবার্তা হয়েছে।’



বৈঠকে রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে নতুন গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।



রাশিয়ার সঙ্গে ইরানের এ আলোচনা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবির বিপরীত। ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, রাশিয়া ইরানকে ‘মোটেও’ সহায়তা করছে না।



যুদ্ধ মোকাবিলায় রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক জোরদার



ইরান ও রাশিয়ার মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি অস্ত্র সরবরাহ চুক্তি হয়েছে বলে জানা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধের পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এসব চুক্তি করা হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।



দ্য টেলিগ্রাফ জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধের পরিস্থিতিতে টিকে থাকার জন্য ইরানি কর্মকর্তাদের কাছে বিভিন্ন প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছিল। এর মধ্যে রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক জোরদার করার বিষয়টিও ছিল।



গোপন নথিতে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর আগে দেশটির সংসদের একটি গোপন কমিটি এসব সুপারিশ তৈরি করেছিল।



সেখানে বলা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের চাপ মোকাবিলায় চীন ও রাশিয়ার মতো স্বাধীন বৈশ্বিক শক্তির সঙ্গে বিশেষ করে সামরিক ক্ষেত্রে কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি আকাশ প্রতিরক্ষা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছিল।



ইরানের প্রতিরক্ষা নীতিতে এস-৪০০ সরবরাহের নতুন অনুরোধকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস হয়েছে। এতে দেশটির আকাশসীমা, পারমাণবিক স্থাপনা ও সামরিক নেতৃত্বকে সুরক্ষা দেওয়ার দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে। নিহত সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনিও এসব হামলার মধ্যে সুরক্ষিত ছিলেন না।



বিশ্লেষক ও আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের মতে, রাশিয়া বহু বছর ধরে ইরানকে এ ধরনের অস্ত্র বিক্রির প্রস্তাব দিয়ে আসছে। তবে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় সরবরাহের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি মস্কো।



রাশিয়ার নিজস্ব আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও বর্তমানে চাপের মধ্যে রয়েছে। ইউক্রেনের দূরপাল্লার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দেশটির তেল শোধনাগার, বিমানঘাঁটি ও অন্যান্য স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে। ফলে ইরানের চাহিদা থাকা সত্ত্বেও নিজেদের সবচেয়ে সক্ষম আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সরবরাহে রাশিয়ার অনীহা থাকতে পারে।


ইরানের জন্য ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ সরঞ্জাম তৈরি করছে রাশিয়া



বৃহস্পতিবার ফাঁস হওয়া রুশ প্রতিরক্ষা শিল্পের নথিতে দেখা গেছে, ইরানের জন্য হেলিকপ্টার থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে রাশিয়া।



রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কারখানাগুলো ইরানের জন্য বিশেষ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ সরঞ্জাম তৈরি করছে। নথিতে এ রপ্তানি চুক্তির সাংকেতিক নাম দেওয়া হয়েছে ‘কে-১০’। একটি নথিতে বলা হয়েছে, এ সাংকেতিক নামটি ইরানের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে।


এসব সরঞ্জামের মধ্যে রয়েছে এলএমইউআর বা পণ্য ৩০৫ নামের নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্রের উৎক্ষেপণব্যবস্থা।



২০২৪ সালের একটি সরবরাহ সূচিতে ইরানকে চূড়ান্ত গ্রাহক হিসেবে উল্লেখ করে রাশিয়ার একটি কারখানায় ৯০টি দুই-রেলবিশিষ্ট উৎক্ষেপণব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি সরবরাহকারী যন্ত্রাংশ তৈরির কথা বলা হয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এসব সরঞ্জাম পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল।


যুদ্ধের পরিকল্পনায় অর্থনীতি ও কূটনীতিও



দ্য টেলিগ্রাফের পর্যালোচনা করা ইরানের যুদ্ধ পরিকল্পনা-সংক্রান্ত নথিতে বলা হয়েছে, গত চার দশকে বিদেশি চাপের বিরুদ্ধে ইরানি জনগণের প্রতিরোধ দেখিয়েছে, দেশের ভেতর থেকে পতন ঘটানোর কৌশল সহজে সফল হবে না।



নথিতে আরও বলা হয়েছে, চীন ও রাশিয়ার মতো নতুন বৈশ্বিক শক্তিগুলো যুক্তরাষ্ট্রের নীতি অনুসরণ করতে অস্বীকৃতি জানানোয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের চলার সুযোগ বেড়েছে।



যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল মোকাবিলায় ইরানের জন্য কয়েকটি পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রতিরোধমূলক অর্থনীতি শক্তিশালী করা, তেল আয়ের ওপর নির্ভরতা কমানো, চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক জোরদার করা এবং আকাশ প্রতিরক্ষা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা বাড়ানো।



এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আচরণের অসংগতি তুলে ধরতে জনসাধারণ ও গণমাধ্যমভিত্তিক কূটনীতি ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ইরান দুর্বল অবস্থানে রয়েছে, পশ্চিমা বিশ্বের এমন ধারণা পরিবর্তনের কথাও বলা হয়েছে।



আঞ্চলিকভাবে ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে, যাতে দেশটির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ কোনো জোট গড়ে উঠতে না পারে। পাশাপাশি সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার মতো প্রতিষ্ঠানে আরও বড় ভূমিকা রাখার কথা বলা হয়েছে।



নথিতে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে বিশ্বের প্রায় ৬০ শতাংশ তেল ও ৪০ শতাংশ গ্যাসের মজুত রয়েছে। এ অঞ্চলে হরমুজ প্রণালি, বাব আল-মান্দেব প্রণালি ও সুয়েজ খালের মতো তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ রয়েছে। এসব পথ দিয়ে বিশ্বের সামুদ্রিক তেল বাণিজ্য ও কনটেইনার পরিবহনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সম্পন্ন হয়।



নথিতে আরও বলা হয়েছে, ওয়াশিংটন বর্তমানে এসব পথের অন্তত দুটিকে হুমকির মুখে মনে করছে। পশ্চিম এশিয়ার গুরুত্ব পশ্চিমা বিশ্বের কাছে কোনোভাবেই কমে যায়নি।



আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে যেকোনো পরিবর্তন জ্বালানি নিরাপত্তা, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতায় সরাসরি প্রভাব ফেলে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার পেছনেও এ যুক্তি ছিল বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।



পারমাণবিক ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনীতির সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। নথিতে বলা হয়েছে, শেষ পর্যন্ত ইরানের পারমাণবিক ইস্যু সমাধানের পথ কূটনীতি। তবে যুক্তরাষ্ট্র তার আঞ্চলিক অংশীদার ও মিত্রদের সঙ্গে প্রতিরক্ষা কূটনীতি চালিয়ে যাচ্ছে।



এর লক্ষ্য ইসরায়েলকে এ অঞ্চলে অন্তর্ভুক্ত করা, সম্পর্ক স্বাভাবিক করা এবং অবকাঠামো, বন্দর, সড়ক, পানি, কৃষি ও প্রযুক্তির মতো ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানো।


নিষেধাজ্ঞাকে সুযোগ হিসেবে দেখছে ইরান



নথিতে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার প্রভাবকে ক্ষতিকর ও গঠনমূলক, দুইভাবেই তুলে ধরা হয়েছে।



এতে বলা হয়েছে, নিষেধাজ্ঞা ইরানের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির উন্নয়ন ধীর করেছে। যুদ্ধবিমান ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ কেনাও প্রায় অসম্ভব করে তুলেছে। তবে এর ফলে নিজস্ব প্রযুক্তিতে অস্ত্র তৈরির সুযোগও তৈরি হয়েছে।



নথিতে ইরানের নিজস্ব আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা বাভার-৩৭৩ এবং শহীদ-১৩৬ ও আবাবিলের মতো ড্রোনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।



এতে বলা হয়েছে, নিষেধাজ্ঞা ইরানের সামরিক সক্ষমতা থামাতে পারেনি। বরং দেশটিকে স্বনির্ভরতার দিকে এগিয়ে দিয়েছে।




শেয়ার করুন