গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার পর ছয় মাসের কার্যক্রম মূল্যায়ন শুরু করেছে বিএনপি সরকার। প্রত্যেকটি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন কাজের বিষয়ে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। কোন মন্ত্রণালয় কেমন করছে, তা নিয়ে তথ্য সংগ্রহ অব্যাহত রয়েছে। তবে এ বিষয়ে সরকারের দায়িত্বশীল কোনো ব্যক্তি বা সংশ্লিষ্ট কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে মন্তব্য করছেন না। এমন অবস্থার মধ্যেই গত শুক্রবার সরকারের মন্ত্রিসভায় আরও ৫ জন নতুন মুখ স্থান পেয়েছে। অন্যদিকে একজনকে পদোন্নতি দিয়ে পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রী করা হয়েছে। তারা শুক্রবার শপথগ্রহণ করে গতকাল প্রথম অফিস করেছেন।
গতকাল রোববার সরেজমিন দেখা যায়, শপথ গ্রহণের পর প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র বাংলাদেশ সচিবালয়ে নতুন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের পদচারণায় এক উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। নবনিযুক্ত মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ে তাদের প্রথম কার্যদিবস শুরু করেন। তাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করতে সচিবালয়ে তাদের শুভানুধ্যায়ীদের উপচেপড়া ভিড় চোখে পড়ে। সেইসঙ্গে বিভিন্ন এলাকার সংসদ সদস্যরাও নিজেদের প্রয়োজনীয় কাজে সচিবালয়ে আসেন। ফলে সপ্তাহের প্রথমদিন হওয়ায় গতকাল মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, তাদের শুভানুধ্যায়ী ও সংসদ সদস্যদের আমগনে সচিবালয় ছিল সরগরম।
সকাল থেকেই সচিবালয়ের বিভিন্ন ভবন ও মন্ত্রণালয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে ছিল বিশেষ প্রস্তুতি ও তৎপরতা। নবনিযুক্ত মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের বরণ করে নিতে ফুল ও শুভেচ্ছা স্মারক হাতে অপেক্ষায় ছিলেন মন্ত্রণালয়গুলোর সিনিয়র সচিব, সচিব ও অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তারা তাদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। এরপর নতুন মন্ত্রীরা দপ্তর ঘুরে দেখেন এবং নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরিচিতিমূলক বৈঠক করেন।
বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, সরকারের কর্মপরিকল্পনা জোরদার এবং প্রশাসনিক গতিশীলতা বাড়ানোর লক্ষ্যেই মন্ত্রিসভায় নতুন মুখ যুক্ত ও দপ্তর বন্টন সম্পন্ন করা হয়েছে। সচিবালয়ে প্রথম কার্যদিবসে নতুন মন্ত্রীরা দেশের আইনশৃঙ্খলা, অর্থনীতি এবং জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে দ্রুত ইতিবাচক পরিবর্তন আনার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। নবনিযুক্ত মন্ত্রীদের আগমনে সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও ব্যাপক কাজের উদ্দীপনা লক্ষ্য করা গেছে। সবাই আশা প্রকাশ করছেন, নতুন নেতৃত্বে প্রশাসনের কাজে আরও গতি ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে।
সরকার ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কাজে গতি ত্বরান্বিত করতে নতুন করে আরও চার মন্ত্রী ও দুজন প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ দেয় সরকার। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় বঙ্গভবনের দরবার হলে আয়োজিত আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানে তাদের শপথবাক্য পাঠ করানো হয়। নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংবিধানের বিধান অনুযায়ী তাদের পদে নিয়োগ দেন এবং শপথ পরিচালনা করেন। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী ছাড়া পূর্ণমন্ত্রী ২৬ এবং প্রতিমন্ত্রী ২৪ জন। মন্ত্রিসভার বাইরে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রয়েছেন ১০ জন। তাদের মধ্যে ৬ জন মন্ত্রীর পদমর্যাদায় এবং ৫ জন প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় দায়িত্ব পালন করছেন।
নবনিযুক্ত চারজন পূর্ণমন্ত্রী হলেন—বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নরসিংদী-২ আসনের সংসদ সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান (স্থানীয় সরকারবিষয়ক), বান্দরবান-৩০০ আসনের সাচিং প্রু জেরী (পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক) এবং বিএনপির জোট শরিক ভোলা-১ আসনের সংসদ সদস্য আন্দালিব রহমান পার্থ (তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়)। একই সঙ্গে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাতকে পদোন্নতি দিয়ে পূর্ণমন্ত্রী করা হয়েছে। তিনি জামালপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য এবং বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির কোষাধ্যক্ষ। নতুন দুই প্রতিমন্ত্রী হলেন- বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হুমায়ুন কবির (পররাষ্ট্র, টেকনোক্র্যাট) ও গাইবান্ধা-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকন (ধর্মবিষয়ক)। তাদের মধ্যে হুমায়ুন কবির এতদিন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পররাষ্ট্র উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।
গতকাল দুপুরে সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে গিয়ে দেখা যায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ড. আব্দুল মঈন খানের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন কয়েকজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্যসহ শুভানুধ্যায়ীরা। তাদের মধ্যে ছিলেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর, নরসিংদী-৫ আসনের এমপি প্রকৌশলী আশরাফ উদ্দিন বকুল ও বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য জেড মোর্তুজা চৌধুরী তুলাসহ অনেকেই। মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান তার শুভানুধ্যায়ীরা। এর আগের সকালে মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন নতুন মন্ত্রী। সেখানে তিনি স্থানীয় সরকার নির্বাচনসহ বিভিন্ন প্রশ্নেরও উত্তর দেন।
জানতে চাইলে স্থানীয় সরকারবিষয়ক মন্ত্রী ড. আব্দুল মঈন খান কালবেলাকে বলেন, প্রথম দিনে তাকে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। তিনি এখন দাপ্তরিক কার্যক্রম বুঝে নিচ্ছেন। পর্যায়ক্রমে কাজে গতি আসবে বলে মনে করেন। কুশল বিনিময় করতে আসা নরসিংদী-৫ আসনের এমপি আশরাফ উদ্দিন বকুল কালবেলাকে বলেন, সরকারের অতি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর স্থানীয় সরকারবিষয়ক মন্ত্রণালয়। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য প্রবীণ রাজনীতিক ড. আব্দুল মঈন খান কে এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ায় আমরা অত্যন্ত খুশি। আশা করছি অতীত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি সফল হবেন।
দেখা গেছে, গতকাল রোববার সচিবালয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে প্রথম কর্মদিবসে এক পরিচিতি সভায় বক্তব্য দেন নবনিযুক্ত মন্ত্রী ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ। এতে তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী এমপি ও প্রধানমন্ত্রীর স্ট্র্যাটেজিক উপদেষ্টা ডা. জাহেদুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তার আগে সকাল সাড়ে ৯টায় মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মন্ত্রীকে ফুল দিয়ে বরণ করে নেন। এ সময় নবনিযুক্ত তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রীকে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক কামাল উদ্দিন সবুজ ফুল দিয়ে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানান। অন্যদের মধ্যে সরকারের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা (পিআইও) সৈয়দ আবদাল আহমদ, বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের এমডি বাছির জামালসহ অনেকেই তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রীকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান।
এ ছাড়াও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক নবনিযুক্ত মন্ত্রী সাচিং প্রু জেরী গতকাল সচিবালয়ে তার মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। এ সময় তিনি নিষ্ঠা ও দায়িত্বের সঙ্গে জনস্বার্থে সরকারের উন্নয়ন কাজ অব্যাহত রাখার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন। পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের সভাপতিত্বে এ সময় অন্যান্যের মধ্যে মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে গতকাল রোববার দুপুরে সচিবালয়ের ৬নং ভবনে নিজ দপ্তরে সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন ধর্ম প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকন। এ সময় তিনি বলেন, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নৈতিকতা বিকাশের মাধ্যমে একটি উদার ও অসাম্প্রদায়িক সর্বজনীন সমাজ প্রতিষ্ঠাকেই প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নিয়ে কাজ করবে ধর্ম মন্ত্রণালয়। সাংবাদিক সম্মেলনে মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।