০৬ জুলাই ২০২৬, সোমবার, ০৫:৩৭:২১ অপরাহ্ন
ঐতিহ্যের দীপ্তি ছড়িয়ে ৭৩ বছরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
  • আপডেট করা হয়েছে : ০৬-০৭-২০২৬
ঐতিহ্যের দীপ্তি ছড়িয়ে ৭৩ বছরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

ইতিহাস, ঐতিহ্য ও জ্ঞানচর্চার দীপ্ত পথচলার ৭৩ বছরে পদার্পণ করল দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিদ্যাপীঠ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি)। ১৯৫৩ সালের ৬ জুলাই মাত্র ১৬১ শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘ পথচলায় আজ রূপ নিয়েছে এক বিশাল আলোকবর্তিকায়।


গৌরবময় এই দীর্ঘ চত্বরে বিশ্ববিদ্যালয়টি যেমন দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন, জাতীয় নেতৃত্ব তৈরি ও জ্ঞানচর্চায় অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে, তেমনই ৭৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই মাহেন্দ্রক্ষণে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মনে জমা হয়েছে নতুন কিছু প্রত্যাশা। বিশেষ করে আবাসন সংকট দূরীকরণ, গবেষণায় বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং একটি আধুনিক ও বৈষম্যহীন ক্যাম্পাস গড়ে তোলাই এখন প্রধান দাবি হয়ে উঠেছে।


ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সুদীর্ঘ পথ


ব্রিটিশ আমলে এই অঞ্চলের শিক্ষার প্রসারে ১৮৭৩ সালে রাজশাহী কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলেও পরে সেখানে উচ্চশিক্ষার সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়ে। এরপরই রাজশাহীতে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলন শুরু হয়। ১৯৫০ সালে গঠন করা হয় ৬৪ সদস্যের কমিটি। আন্দোলনের একপর্যায়ে ১৫ জন ছাত্রনেতা কারাবরণও করেন।


অবশেষে প্রখ্যাত আইনজীবী মাদার বখশ ও প্রথম উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইতরাত হোসেন জুবেরীর প্রচেষ্টায় ১৯৫৩ সালের ৩১ মার্চ প্রাদেশিক আইনসভায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আইন পাস হয় এবং ৬ জুলাই রাজশাহী কলেজে শুরু হয় এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা।


১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান, দেশের প্রতিটি বাঁক পরিবর্তনে রাবির শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা রাজপথে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। ১৯৬৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি শিক্ষার্থীদের বাঁচাতে গিয়ে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর গুলিতে শহীদ হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহার আত্মত্যাগ এ দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনকে বেগবান করেছিল।


বর্তমান চালচিত্র ও গুণীজন


বর্তমানে ৩০৩ দশমিক ৮০ হেক্টর আয়তনের এই সবুজ ক্যাম্পাসে বিদেশি শিক্ষার্থীসহ প্রায় ৩৮ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন, যার প্রায় অর্ধেকই ছাত্রী। জ্ঞান বিতরণে নিয়োজিত আছেন প্রায় ১ হাজার ১০০ জন শিক্ষক। ১২টি অনুষদের অধীনে রয়েছে ৫৯টি বিভাগ ও একাধিক ইনস্টিটিউট। শিক্ষার্থীদের থাকার জন্য রয়েছে ১৭টি আবাসিক হল এবং গবেষকদের জন্য একটি আন্তর্জাতিক ডরমেটরি।


সুদীর্ঘ এই সময়ে রাবি তৈরি করেছে বহু কালজয়ী মানুষ। ভাষাবিজ্ঞানী ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক ও সেলিনা হোসেন, ইতিহাসবিদ আব্দুল করিম, তাত্ত্বিক বদরুদ্দীন উমর, নাট্যকার মলয় ভৌমিক, চলচ্চিত্র নির্মাতা গিয়াসউদ্দিন সেলিম কিংবা ক্রিকেটার আল-আমিন হোসেনের মতো অসংখ্য গুণীজন এই ক্যাম্পাসেরই সৃষ্টি।


সংকট ও প্রত্যাশা


৭৩ বছরের দীর্ঘ পথচলায় আকাশচুম্বী সাফল্য থাকলেও আবাসন সংকট ও গবেষণায় সীমিত বরাদ্দের মতো কিছু চিরচেনা সমস্যা এখনও কাটেনি। বর্তমানে মাত্র ৩৩ শতাংশ শিক্ষার্থী আবাসিক হলের সুবিধা পাচ্ছেন।


শিক্ষার্থীদের মতে, ক্যাম্পাসের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন আবাসন সংকট ও হলের সিট বাণিজ্য বন্ধ করা।


প্রাণিবিদ্যা বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী হাবিবা আক্তার রিয়া বলেন, আমরা চাই সিট সংকটের স্থায়ী সমাধান, গবেষণার প্রসার এবং একটি বৈষম্যহীন নিরাপদ ক্যাম্পাস, যেখানে মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটবে। অন্যদিকে ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সাকিব ইসলাম মনে করেন, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের আধুনিকায়ন, মেডিকেল সেন্টারের সেবার মান বৃদ্ধি এবং শিক্ষক-কর্মকর্তা নিয়োগে শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।


গবেষণায় আরও বিনিয়োগের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইয়ামিন হোসেন বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়কে বৈশ্বিক মানদণ্ডে নিয়ে যেতে হলে গবেষণা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো, আধুনিক গবেষণাগার স্থাপন ও তরুণ গবেষকদের জন্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এতে গবেষণার বাস্তব প্রয়োগ ও নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে।’


শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের এসব প্রত্যাশা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ফরিদুল ইসলাম আশাবাদের কথা শুনিয়েছেন।


তিনি বলেন, আমাদের মূল লক্ষ্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি আধুনিক, গবেষণাবান্ধব ও শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে রূপান্তর করা। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে আবাসন সুবিধা আরও বাড়ানো হবে। একই সাথে সেশনজট শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা এবং উচ্চশিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধিকে আমরা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছি। ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা জোরদারে সিসিটিভি স্থাপন ও আলোকায়ন বৃদ্ধির কাজ চলছে।


দিনব্যাপী নানা আয়োজন


প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সোমবার (৬ জুলাই) ক্যাম্পাসে বর্ণাঢ্য কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। সকাল ১০টা ৫ মিনিটে জাতীয় সংগীত পরিবেশন ও পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে উৎসবের সূচনা হবে। এরপর বেলুন-পায়রা ওড়ানো, আনন্দ শোভাযাত্রা ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে। বেলা সাড়ে ১১টায় সিনেট ভবনে অনুষ্ঠিত হবে আলোচনা সভা।


উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ফরিদুল ইসলামের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন ভূমিমন্ত্রী মো. মিজানুর রহমান মিনু। প্রধান আলোচক হিসেবে থাকবেন কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য প্রফেসর মো. রফিকুল ইসলাম।


এছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে সংসদ সদস্য মো. শফিকুল হক মিলনসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্যদ্বয় উপস্থিত থাকবেন। বিকেলে স্টেডিয়ামে খেলাধুলা এবং সন্ধ্যায় কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দিনব্যাপী এই উৎসবের সমাপ্তি ঘটবে।


শেয়ার করুন