০৬ জুলাই ২০২৬, সোমবার, ০৬:৪২:০০ অপরাহ্ন
রাজশাহীর বুকে ১৩২ বছরের সাক্ষী জরাজীর্ণ টাওয়ার
রাকিবুল হোসেন শাহীন
  • আপডেট করা হয়েছে : ০৫-০৭-২০২৬
রাজশাহীর বুকে ১৩২ বছরের সাক্ষী জরাজীর্ণ টাওয়ার

রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার পানানগর ইউনিয়নের পানানগর গ্রামের মাঠের মাঝে আজো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে একটি জরাজীর্ণ ইটের টাওয়ার। প্রথম দেখায় এটিকে সাধারণ একটি প্রাচীন কাঠামো মনে হতে পারে, তবে এর প্রতিটি ইটে লেপ্টে আছে ব্রিটিশ শাসনামলের রক্ত, ঘাম আর শোষণের নির্মম ইতিহাস। ১৮৯৪ সালে নির্মিত এই পানানগর নীলকুঠি একসময় ছিল এ অঞ্চলের নীল চাষের প্রধান প্রাণকেন্দ্র। আজ দীর্ঘ ১৩২ বছর পর সেই গৌরব ও বেদনার ঐতিহ্য টিকে আছে কেবল মানুষের স্মৃতিতে আর এই একটিমাত্র ভগ্ন টাওয়ারে।


ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইউরোপের বাজারে কাপড়ের রঙ হিসেবে নীলের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হলে ব্রিটিশরা বাংলার কৃষকদের ওপর জোরপূর্বক নীল চাষ চাপিয়ে দেয়। তখনকার দিনে নীলকে বলা হতো ‘নীল সোনা’। আর রাজশাহী, নাটোর ও পাবনা অঞ্চল ছিল এই নীল চাষের অন্যতম প্রধান এলাকা। ইতিহাসবিদদের মতে, ব্রিটিশদের এই অমানবিক শোষণের বিরুদ্ধে ১৮৫৯ সালে বাংলার কৃষকরা এক ঐতিহাসিক বিদ্রোহ গড়ে তোলেন, যা ‘নীল বিদ্রোহ’ নামে পরিচিত। এই বিদ্রোহের সময় রাজশাহী অঞ্চলের নীলকুঠিগুলো ছিল ব্রিটিশদের প্রশাসনিক ও নির্যাতন কেন্দ্র। পানানগরের এই কুঠি থেকেই তখন আশপাশের ১০-১২টি গ্রামের নীল চাষাবাদ কঠোরভাবে তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ করা হতো।


স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা সেকেন্দার আলী জানান, একসময় এই চত্বরে বিশাল দালান, নীল প্রক্রিয়াজাতকরণের গুদামঘর ও কর্মচারীদের থাকার জন্য বড় আবাসন ব্যবস্থা ছিল। কুঠির সাহেবরা এখান থেকে ঘোড়ায় চড়ে আশপাশের এলাকা দাপিয়ে বেড়াতেন। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে ও যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেই বিশাল কুঠিবাড়ির প্রায় সবটুকুই আজ মাটির সাথে মিশে গেছে। কালের পরিক্রমায় কালের সাক্ষী হিসেবে বর্তমানে টিকে আছে কেবল তিন তলা সমান উঁচু একটি জরাজীর্ণ ইটের টাওয়ার।


সরেজমিনে পরিদর্শনে দেখা যায়, ঐতিহাসিক এই টাওয়ারটির অবস্থা এখন অত্যন্ত নাজুক। পুরো টাওয়ারের গায়ে বিশাল সব ফাটল ধরেছে, নিচের দিকের ইটগুলো খসে খসে পড়ছে। দেয়াল জুড়ে চেপে বসেছে বট-অশ্বত্থ গাছের শিকড়, যা স্থাপনাটিকে প্রতিনিয়ত ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই টাওয়ারের ঠিক পাশেই টিনের ঘরে বসবাস করেন আজগর মণ্ডল। তিনি বলেন, তার বাপ-দাদার মুখে শুনেছেন এটি একটি নীলকুঠি ছিল এবং এখানে আগে অনেক বড় বড় ঘর ছিল। এখন আর কিছুই অবশিষ্ট নেই, কেবল এই টাওয়ারটাই শেষ স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে কোনোমতে টিকে আছে।


ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক রবিউল ইসলাম এই স্থাপনার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ব্রিটিশ আমলের নীলকুঠিগুলো আমাদের অঞ্চলের কৃষি আন্দোলনের ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। পানানগরের এই স্থাপনাটি রাজশাহী অঞ্চলের কৃষকদের শোষণ ও সংগ্রামের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, যা নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মনে করেন, যদি সরকারি উদ্যোগে এটিকে দ্রুত সংরক্ষণ করা যায় এবং এর ইতিহাস সংবলিত একটি তথ্য ফলক স্থাপন করা হয়, তবে নতুন প্রজন্ম তাদের শিকড় ও ইতিহাস সম্পর্কে সঠিক ধারণা পাবে। একই সাথে ভবিষ্যতে এটি একটি চমৎকার শিক্ষা ও পর্যটন কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে উঠতে পারে। কারণ একটি জাতির শিকড় লুকিয়ে থাকে তার ইতিহাসে। পানানগরের এই নীলকুঠি শুধু ইট-পাথরের স্তূপ নয়, এটি আমাদের পূর্বপুরুষদের সংগ্রাম, ত্যাগ আর যন্ত্রণাদায়ক কৃষি জীবনের গল্প বলে।


বর্তমানে এলাকাবাসীর দাবি, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর যেন অতি দ্রুত এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটিকে চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সুরক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করে। টাওয়ারটির চারপাশে অন্তত একটি সীমানা বেড়া এবং এর ইতিহাস তুলে ধরে একটি সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিলে সাধারণ মানুষ এর গুরুত্ব সহজেই বুঝতে পারবে।


দীর্ঘ ১৩২ বছর ধরে বহু ঝড়-ঝাপটা ও ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই নীলকুঠিটি এখন ধ্বংসের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। আমাদের অতীতকে টিকিয়ে রাখতে এবং পূর্বপুরুষদের সংগ্রামের গল্পটা বাঁচিয়ে রাখতে এই শেষ চিহ্নটুকু রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি।

শেয়ার করুন