২০ জানুয়ারী ২০২৬, মঙ্গলবার, ১২:২২:১০ অপরাহ্ন
ট্রাম্পের ২৪ ঘণ্টায় যুদ্ধ বন্ধের প্রতিশ্রুতি ১ বছর পরও অন্ধকারে
  • আপডেট করা হয়েছে : ২০-০১-২০২৬
ট্রাম্পের ২৪ ঘণ্টায় যুদ্ধ বন্ধের প্রতিশ্রুতি ১ বছর পরও অন্ধকারে

ডোনাল্ড ট্রাম্প আত্মপ্রচারে বরাবরই অতুলনীয়। সত্য-মিথ্যার সীমা ঝাপসা করে নিজের ‘সক্ষমতা’ নিয়ে তিনি এমন আত্মবিশ্বাস দেখান যে, তার অনুসারীদের পাশাপাশি অনেক সাধারণ মানুষও সেই বাগাড়ম্বরকে বাস্তব ভেবে বসেন।



রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থান তারই একটি বড় উদাহরণ। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই তিনি বারবার দাবি করে আসছিলেন—জো বাইডেন নয়, তিনি ক্ষমতায় থাকলে এই যুদ্ধ হতোই না। এমনকি ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে তিনি বলেন, আলোচনার মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই যুদ্ধ থামিয়ে দিতে পারবেন।


পরের কয়েক মাসে একই বক্তব্য ঘুরে ফিরে এসেছে নানা মঞ্চে। ২০২৩ সালের মে মাসে সিএনএনের এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন, রুশ ও ইউক্রেনীয়রা মরছে, আর তিনি চান এই মৃত্যু থামুক—এবং তা তিনি একদিনেই করে দেখাবেন। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারে তিনি আরও একধাপ এগিয়ে জানান, যুদ্ধ থামানোর জন্য তার কাছে ‘সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা’ আছে, যদিও সেটি প্রকাশ করেননি।


সিএনএনের এক ফ্যাক্টচেক অনুযায়ী, ২০২৩–২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্প অন্তত ৫৩ বার প্রকাশ্যে বলেছেন, তিনি ক্ষমতায় গেলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যুদ্ধ শেষ করবেন। তখনই বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে বলেছিলেন—এটি রাজনৈতিক বক্তব্য, বাস্তবসম্মত নয়।


২০২৪ সালের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দায়িত্ব নিয়েই তার প্রথম কাজ হবে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করা। কিন্তু ২০ জানুয়ারি ২০২৫, দ্বিতীয় দফায় হোয়াইট হাউসে ফেরার পর সেই প্রতিশ্রুতির কোনো বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায়নি।


ট্রাম্প ইউক্রেনবিষয়ক বিশেষ দূত হিসেবে নিয়োগ দেন কেইথ কেলগকে। তার লক্ষ্য ছিল ১০০ দিনের মধ্যে যুদ্ধের সমাধান। সেই সময়সীমাও পার হয়েছে, কিন্তু যুদ্ধ থামেনি।


২০২৫ সালের এপ্রিলের শেষদিকে টাইম সাময়িকীকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পকে যখন তার ‘প্রথম দিনের’ প্রতিশ্রুতি মনে করিয়ে দেওয়া হয়, তখন তিনি বলেন—কথাটা তিনি ‘গুরুত্ব দিয়ে’ বলেননি। অথচ আগের বক্তব্যগুলোতে তার দৃঢ়তা ও আত্মবিশ্বাস সেই দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।


এবার তিনি ভিন্ন ব্যাখ্যার আশ্রয় নেন। ট্রাম্প বলেন, রাশিয়া ও ইউক্রেনের নেতৃত্বের মধ্যে ‘অকল্পনীয় ঘৃণা’ রয়েছে, যা শান্তিপ্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় বাধা। কখনো তিনি দায় চাপান রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন–এর ওপর, আবার কখনো তীব্র সমালোচনা করেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি–কে।


ট্রাম্প অবশ্য আলোচনার চেষ্টা বন্ধ করেননি। পুতিন ও জেলেনস্কি—দুই পক্ষের সঙ্গেই যোগাযোগ রাখছেন তিনি। বর্তমানে তিনি একটি ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছেন। গত বছরের ডিসেম্বরে ফ্লোরিডার মার-এ-লাগোতে ট্রাম্প–জেলেনস্কি বৈঠকের পর ইউক্রেন জানায়, পরিকল্পনার প্রায় ৯০ শতাংশ বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নিয়েও ঐকমত্য তৈরি হয়েছে।


তবে বড় বাধা রয়ে গেছে রাশিয়ার শর্তগুলো। মস্কোর দাবি, পুরো দনবাস অঞ্চল রাশিয়ার হাতে ছেড়ে দিতে হবে এবং ইউক্রেন কখনো ন্যাটোর সদস্য হতে পারবে না। ট্রাম্প নিজেও ন্যাটোতে ইউক্রেনের অন্তর্ভুক্তির বিরোধিতা করেছেন। তার প্রস্তাবিত শান্তি কাঠামোয় দনবাস রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে দেওয়ার কথা থাকলেও কিয়েভ এই প্রস্তাবে স্পষ্টভাবে নারাজ।


জেলেনস্কির ভাষায়, ইউক্রেন শান্তি চায়, কিন্তু নিজের রাষ্ট্রীয় অস্তিত্ব বিসর্জন দিয়ে নয়।


এই প্রেক্ষাপটে কিয়েভভিত্তিক চিন্তক প্রতিষ্ঠান পেন্টা সেন্টারের প্রধান ভলোদিমির ফেসেনকো আল–জাজিরাকে বলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে অগ্রগতি থেমে গেলে এবং রাশিয়া যদি বুঝতে পারে ইউক্রেন দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ সহ্য করতে পারবে, তখনই মস্কো সমঝোতায় আসতে পারে। তার মতে, ২০২৬ সালে যদি অচলাবস্থা স্পষ্ট হয়, তাহলে ২০২৬ সালের শেষ দিকে শান্তিচুক্তির সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে—নচেৎ যুদ্ধ ২০২৭ সালেও গড়াতে পারে।


২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর চার বছরে পা দিতে যাচ্ছে এই যুদ্ধ। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের তথ্য অনুযায়ী, ইউক্রেনের প্রায় ২০ শতাংশ ভূখণ্ড বর্তমানে রাশিয়ার দখলে, যার মধ্যে ২০১৪ সালে দখল করা ক্রিমিয়াও রয়েছে।


গত সপ্তাহে রয়টার্সকে দেওয়া এক বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, পুতিন শান্তিচুক্তিতে প্রস্তুত, কিন্তু ইউক্রেন ততটা নয়—এবং দায় চাপান জেলেনস্কির ওপর। যদিও ইউরোপীয় মিত্রদের দাবি, যুদ্ধ বন্ধে কিয়েভের চেয়ে মস্কোর অনীহাই বেশি।


ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক টিনা ফোর্ডহ্যামের একটি মন্তব্য এই বাস্তবতাকে সংক্ষেপে তুলে ধরে—‘যুদ্ধ শুরু করা সহজ, কিন্তু থামানো কঠিন।’


ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার এক বছর পূর্ণ হলো আজ। এই ৩৬৫ দিনেও তার সেই বহুল উচ্চারিত ‘২৪ ঘণ্টা’র প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ নেয়নি।


শেয়ার করুন