৩১ অক্টোবর ২০২৬, শনিবার, ০৮:০৪:০৩ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
পলায়ন ও অসদাচরণের ঘটনায় চাকরি গেল ৭ পুলিশ কর্মকর্তার
  • আপডেট করা হয়েছে : ৩১-১০-২০২৬
পলায়ন ও অসদাচরণের ঘটনায় চাকরি গেল ৭ পুলিশ কর্মকর্তার

কর্মস্থলে দীর্ঘদিন অনুপস্থিতি, সরকারি নির্দেশ অমান্য এবং অসদাচরণের অভিযোগে পুলিশের সাত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে ছয় কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। আরেকজনকে দেওয়া হয়েছে বাধ্যতামূলক অবসর। বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে ডিআইজি, অতিরিক্ত ডিআইজি, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও সহকারী পুলিশ কমিশনার পদমর্যাদার কর্মকর্তারা রয়েছেন।


শনিবার (৩১ অক্টোবর) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা-১ ও শৃঙ্খলা-২ শাখা থেকে জারি করা পৃথক প্রজ্ঞাপন এবং সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনায় এসব তথ্য পাওয়া গেছে। সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী বিভাগীয় তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া, সরকারি কর্ম কমিশনের পরামর্শ এবং রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর এসব শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।


বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তারা হলেন সাবেক ডিআইজি মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ, সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি শ্যামল কুমার মুখার্জী, সাবেক ডিআইজি মো. আনিসুর রহমান, সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার ফারহানা তাসকিন, সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. মনিরুজ্জামান সরকার এবং সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এস এম জাহাঙ্গীর হাছান। আর সহকারী পুলিশ সুপার কাজী মিজানুর রহমানকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে।


বিদেশে গিয়ে আর ফেরেননি দুই কর্মকর্তা


বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে ফারহানা তাসকিন ও মো. মনিরুজ্জামান সরকারের বিরুদ্ধে বিদেশে অবস্থান করে দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগ রয়েছে।


ফারহানা তাসকিন ডিএমপির প্রশাসন-ট্রাফিক উত্তর বিভাগের সহকারী পুলিশ কমিশনার ছিলেন। স্বামীর সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে ২০১৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ৪২ দিনের বহিঃবাংলাদেশ ছুটি নিয়ে কানাডায় যান তিনি। পরে অসুস্থতার কথা জানিয়ে আরও ৩৬ দিনের ছুটি বৃদ্ধির আবেদন করেন। এরপর কানাডার একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তিন বছর মেয়াদি সিপিএ কোর্সে পড়ার জন্য শিক্ষাছুটির আবেদন করেন। তবে মন্ত্রণালয় সেই আবেদন নাকচ করে তাকে দেশে ফিরে কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দেয়। কিন্তু তিনি আর ফেরেননি।


প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালের ২৮ মার্চ ছুটি শেষ হওয়ার পরও তিনি কর্মস্থলে যোগ দেননি। তার বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বিভাগীয় মামলা করা হয়। তদন্তে পলায়নের অভিযোগ প্রমাণিত হয়। দ্বিতীয় কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাবও দেননি তিনি। পরে সরকারি কর্ম কমিশনের পরামর্শ ও রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর ২০১৮ সালের ২৮ মার্চ থেকে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।


অন্যদিকে, ডিএমপির সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. মনিরুজ্জামান সরকার যুক্তরাজ্যের কিংস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে অপরাধবিজ্ঞানে পিএইচডি করার জন্য ২০১২ সালে প্রেষণে যান। পরে কয়েক দফায় তার বিনা বেতনে ছুটি বাড়ানো হয়। সর্বশেষ ২০১৯ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত আরও দুই বছরের ছুটির আবেদন করেন তিনি। তবে সেই আবেদন নাকচ করে তাকে দেশে ফিরে কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। নির্দেশনা পাওয়ার পরও তিনি দেশে ফেরেননি।


এ ঘটনায় ২০২০ সালের ৫ অক্টোবর তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়। তদন্তে অসদাচরণ ও পলায়নের অভিযোগ প্রমাণিত হয়। দ্বিতীয় কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাব না দেওয়ায় এবং সরকারি কর্ম কমিশনের পরামর্শের পর রাষ্ট্রপতির অনুমোদনক্রমে ২০১৯ সালের ১ জুলাই থেকে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।


কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন তিন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা


ডিআইজি মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ সর্বশেষ ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন তিনি। তার বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা এবং ই-মেইলে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও কর্মস্থলে ফেরেননি।


এ ঘটনায় ২০২৬ সালের ১৫ এপ্রিল তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়। তদন্ত শেষে পলায়নের অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়। দ্বিতীয় কারণ দর্শানোর নোটিশেরও জবাব দেননি তিনি। পরে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন ও সরকারি কর্ম কমিশনের পরামর্শক্রমে ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।


সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি শ্যামল কুমার মুখার্জী সর্বশেষ ট্যুরিস্ট পুলিশে কর্মরত ছিলেন। ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি তাকে রাজশাহীতে রেঞ্জ ডিআইজির কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়। ২২ জানুয়ারি সেখানে যোগদানের পর একই দিন তিন সপ্তাহের বিশ্রামের কথা উল্লেখ করে প্রস্থান প্রতিবেদন জমা দেন। তবে নির্ধারিত সময় শেষে কর্মস্থলে আর যোগ দেননি। তার বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ৩ জুলাই বিভাগীয় মামলা করা হয়। তদন্তে পলায়নের অভিযোগ প্রমাণিত হয়। পরে ২০২৫ সালের ২২ জানুয়ারি থেকে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।


অন্যদিকে, রাজশাহী রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি মো. আনিসুর রহমান ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট নৌ পুলিশে সংযুক্ত হয়ে যোগদান করেন। অসুস্থতার কথা জানিয়ে ২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি একটি প্রতিবেদন জমা দিলেও তাতে ছুটির ধরন, মেয়াদ ও অবস্থানের স্থান উল্লেখ করেননি। প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও জমা দেননি। একাধিকবার নোটিশ পাঠানোর পরও কর্মস্থলে যোগ দেননি তিনি।


এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে অসদাচরণ ও পলায়নের অভিযোগে বিভাগীয় মামলা হয়। তদন্তে উভয় অভিযোগ প্রমাণিত হয়। সরকারি কর্ম কমিশনের পরামর্শ ও রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর ২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।


ছুটি শেষে ফেরেননি অতিরিক্ত পুলিশ সুপার


সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এস এম জাহাঙ্গীর হাছান নৌ পুলিশের টাঙ্গাইল অঞ্চলে কর্মরত ছিলেন। তিনি ১৫ দিনের বহিঃবাংলাদেশ ছুটি নিয়ে ২০২৪ সালের ৮ অক্টোবর কর্মস্থল ত্যাগ করেন। পরবর্তী সময়ে আরও ৬০ দিনের ছুটি বৃদ্ধির আবেদন নাকচ হলেও কর্মস্থলে যোগ দেননি। তার বিরুদ্ধে পলায়নের অভিযোগে বিভাগীয় মামলা করা হয়। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সরকারি কর্ম কমিশনের পরামর্শ ও রাষ্ট্রপতির অনুমোদনক্রমে ২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবর থেকে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে।


অসদাচরণে সহকারী পুলিশ সুপারের বাধ্যতামূলক অবসর


অন্যদিকে, সহকারী পুলিশ সুপার কাজী মিজানুর রহমানকে চাকরি থেকে বরখাস্ত না করে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে। তিনি সিআইডির দিনাজপুর জেলায় কর্মরত ছিলেন। এর আগে ডিএমপির তেজগাঁও ট্রাফিক জোনে সহকারী পুলিশ কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।


বিভাগীয় মামলার অভিযোগে বলা হয়, ২০২২ সালের এপ্রিল মাসে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের এক কনস্টেবলের স্ত্রীর সঙ্গে ফেসবুকের মাধ্যমে তার পরিচয় হয়। পরে ওই নারীর সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়ানোর অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলার আদালতের পর্যবেক্ষণেও তাদের স্বেচ্ছায় শারীরিক সম্পর্কের বিষয়টি উঠে আসে বলে বিভাগীয় নথির সারসংক্ষেপে উল্লেখ রয়েছে।


একজন পুলিশ কর্মকর্তার এমন কর্মকাণ্ডে বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়েছে বলে বিভাগীয় তদন্তে উল্লেখ করা হয়। সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর ৩(খ) বিধি অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ আনা হয়। বিভাগীয় তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর তাকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সরকারি কর্ম কমিশনের পরামর্শ ও রাষ্ট্রপতির ২৫ অক্টোবরের অনুমোদনের পর এ আদেশ জারি করা হয়।


স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এসব প্রজ্ঞাপনে রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে স্বাক্ষর করেন সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া শাস্তিমূলক আদেশগুলো অবিলম্বে কার্যকরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।




শেয়ার করুন