২৩ অগাস্ট ২০২৬, রবিবার, ১০:১১:৪৫ অপরাহ্ন
দাম্পত্য জীবন বরকতময় করতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মহামূল্যবান ১২ উপদেশ
  • আপডেট করা হয়েছে : ২৩-০৮-২০২৬
দাম্পত্য জীবন বরকতময় করতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মহামূল্যবান ১২ উপদেশ

বিয়ে শুধু দুটি মানুষের মিলন নয়; এটি দুটি পরিবার, দুটি হৃদয় এবং দুটি জীবনের পবিত্র বন্ধন। ইসলামে বিয়ে একটি ইবাদত, একটি সুন্নাহ এবং ইমানকে পরিপূর্ণ করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাই ইসলাম বিয়েকে শুধু একটি সামাজিক অনুষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি মহান পথ হিসেবে দেখেছে।


আজকাল বিয়ে মানেই অনেকের কাছে জাঁকজমক, অপচয় ও প্রতিযোগিতা। অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের এমন একটি সহজ, বরকতময় ও কল্যাণকর বিয়ের শিক্ষা দিয়েছেন, যেখানে থাকে তাকওয়া, ভালোবাসা, পারস্পরিক সম্মান এবং আল্লাহর রহমত।


বিয়ে ইমানকে পরিপূর্ণ করে


রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—


مَنْ تَزَوَّجَ فَقَدِ اسْتَكْمَلَ نِصْفَ الْإِيمَانِ، فَلْيَتَّقِ اللَّهَ فِي النِّصْفِ الْبَاقِي


‘যে ব্যক্তি বিয়ে করল, সে তার ইমানের অর্ধেক পূর্ণ করল। অতএব, বাকি অর্ধেকের ব্যাপারে সে যেন আল্লাহকে ভয় করে।’ (তাবারানি ৭৬৪৫)


মহান আল্লাহ দাম্পত্য জীবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন, ‘আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই জীবনসঙ্গী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করো; আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া স্থাপন করেছেন।’ (সুরা : রূম, আয়াত : ২১)


রাসুলুল্লাহ (সা.) নবদম্পতির জন্য এমন কিছু নীতি ও আদর্শ রেখে গেছেন, যা অনুসরণ করলে দাম্পত্য জীবন হয়ে উঠতে পারে শান্তিময়, বরকতময় ও সুন্দর। সেগুলো হলো-


১. আল্লাহর নাম নিয়ে নতুন জীবন শুরু করা


দাম্পত্য জীবনের শুরুতেই স্বামী-স্ত্রীর উচিত আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া এবং নিজেদের সম্পর্ককে তাঁর আনুগত্যের অধীন রাখা।


সুখের মুহূর্তে আল্লাহকে স্মরণ করলে সংসারে বরকত আসে এবং বিপদের সময় ধৈর্য ধারণের শক্তি পাওয়া যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) নতুন দাম্পত্য জীবনের জন্য বরকতের দোয়া করতে শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি নবদম্পতিকে দোয়া করতেন, 

بَارَكَ اللَّهُ لَكَ، وَبَارَكَ عَلَيْكَ، وَجَمَعَ بَيْنَكُمَا فِي خَيْرٍ


অর্থ : ‘আল্লাহ তোমার জন্য বরকত দান করুন, তোমার ওপর বরকত নাজিল করুন এবং তোমাদের উভয়কে কল্যাণের মধ্যে একত্রিত রাখুন।’ (আবু দাউদ, হাদিস: ২১৩০, তিরমিজি, হাদিস : ১০৯১)


২. স্ত্রীর সঙ্গে সদাচরণ করা


ইসলামে স্বামীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো স্ত্রীর সঙ্গে উত্তম আচরণ করা।


সংসারে মতের অমিল হতে পারে, ভুল হতে পারে; কিন্তু একজন মুসলিম স্বামীর আচরণে যেন অন্যায়, অপমান ও নিষ্ঠুরতা স্থান না পায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে-ই, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম। আর আমি আমার পরিবারের কাছে তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৩৮৯৫)


৩. স্ত্রীর অধিকার আদায় করা


বিবাহের মাধ্যমে স্ত্রী স্বামীর ওপর বিভিন্ন অধিকার লাভ করেন। ভরণপোষণ, নিরাপত্তা, সম্মান, সদাচরণ—এসব তার প্রাপ্য।


মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর নারীদের জন্যও ন্যায়সংগত অধিকার রয়েছে, যেমন তাদের ওপর রয়েছে অধিকার।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২২৮)

অতএব, সংসারকে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জায়গা না বানিয়ে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্র হিসেবে দেখা উচিত।


৪. স্বামীর প্রতিও সম্মান ও সহযোগিতা বজায় রাখা


যেমন স্বামীর ওপর স্ত্রীর অধিকার রয়েছে, তেমনি স্ত্রীর ওপরও স্বামীর অধিকার রয়েছে। স্ত্রী স্বামীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবেন, বৈধ বিষয়ে সহযোগিতা করবেন এবং সংসারের শান্তি রক্ষায় ভূমিকা রাখবেন। তবে ইসলামে আনুগত্যের অর্থ আল্লাহর অবাধ্যতায় কারও আনুগত্য নয়। বৈধ ও কল্যাণকর বিষয়ে পারস্পরিক সহযোগিতাই একটি সুন্দর দাম্পত্যের ভিত্তি।


৫. ভালোবাসা প্রকাশ করতে সংকোচ না করা


অনেক সময় মানুষ মনে করে, ভালোবাসা অন্তরে থাকলেই যথেষ্ট। কিন্তু দাম্পত্য জীবনে ভালোবাসা প্রকাশ করাও গুরুত্বপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) তার স্ত্রীদের সঙ্গে কোমল, স্নেহপূর্ণ ও আন্তরিক আচরণ করতেন। আয়েশা (রা.)-এর সঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কোমল আচরণের বহু ঘটনা হাদিসে এসেছে। এতে বোঝা যায়, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক কেবল দায়িত্ব পালনের সম্পর্ক নয়; এটি স্নেহ, রসিকতা, ভালোবাসা ও বন্ধুত্বেরও সম্পর্ক।


৬. গোপনীয়তা রক্ষা করা


স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার ব্যক্তিগত বিষয় অন্যের কাছে প্রকাশ করা অত্যন্ত নিন্দনীয়। বিশেষ করে দাম্পত্য জীবনের অন্তরঙ্গ বিষয় অন্যের কাছে আলোচনা করা ইসলামে কঠোরভাবে নিষেধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট মর্যাদার ব্যক্তি হলো সে, যে তার স্ত্রীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার পর তার গোপন কথা প্রকাশ করে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৪৩৭)


তাই নবদম্পতির উচিত—সংসারের ব্যক্তিগত বিষয় বন্ধু, আত্মীয় কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ না করা।


৭. রাগের সময় সংযমী হওয়া


দাম্পত্য জীবনে মতপার্থক্য আসতেই পারে। কিন্তু সামান্য বিষয়কে কেন্দ্র করে রাগ, গালাগালি, অপমান কিংবা বিচ্ছেদের হুমকি দেওয়া কোনোভাবেই সুস্থ সংসারের লক্ষণ নয়। এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে উপদেশ চাইলে তিনি বলেন, ‘রাগ কোরো না।’ লোকটি বারবার উপদেশ চাইলে তিনি প্রতিবারই বললেন, ‘রাগ কোরো না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬১১৬)


তাই স্বামী-স্ত্রী উভয়ের উচিত রাগের সময় নীরব হওয়া, স্থান পরিবর্তন করা, অজু করা এবং পরিস্থিতি শান্ত হলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা।


৮. একে অপরের ভুল ক্ষমা করা


কেউই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। নতুন সংসারে দুজন মানুষ একে অপরের অভ্যাস ও স্বভাবের সঙ্গে পরিচিত হতে সময় নেবে। তাই ছোটখাটো ভুলকে বড় করে দেখা উচিত নয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা ক্ষমা ও উপেক্ষার নীতি অবলম্বন করো এবং ভালো কাজের নির্দেশ দাও।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ১৯৯)


ক্ষমা সংসারকে দুর্বল করে না; বরং ভালোবাসাকে আরও গভীর করে।


৯. একে অপরের ইবাদতে সহযোগিতা করা


একটি আদর্শ মুসলিম পরিবার হলো এমন পরিবার, যেখানে স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির ও নেক আমলের প্রতি উৎসাহিত করেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবারকে আগুন থেকে রক্ষা করো।’ (সুরা : তাহরিম, আয়াত : ৬)


অতএব, নবদম্পতির উচিত একে অপরকে শুধু দুনিয়ার সফলতার দিকে নয়, আখিরাতের সফলতার দিকেও এগিয়ে নেওয়া।


১০. পরস্পরের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা


সংসারে শুধু নিজের প্রাপ্তির হিসাব করলে অশান্তি বাড়ে। বরং জীবনসঙ্গী যে ভালো কাজগুলো করেন, সেগুলোর স্বীকৃতি ও প্রশংসা করা উচিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞ নয়, সে আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞ নয়।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৮১১, তিরমিজি, হাদিস : ১৯৫৪)


স্বামী যদি স্ত্রীর পরিশ্রমের প্রশংসা করেন এবং স্ত্রী যদি স্বামীর দায়িত্বশীলতার মূল্যায়ন করেন, তাহলে সংসারে ভালোবাসা আরও দৃঢ় হয়।


১১. দাম্পত্য সম্পর্ককে ইবাদতের অংশ মনে করা


ইসলাম বৈধ দাম্পত্য সম্পর্ককেও সওয়াবের কাজ হিসেবে গণ্য করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কারও যৌনসম্পর্কেও সদকা রয়েছে।’ সাহাবিরা বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমাদের কেউ তার কামনা পূরণ করেও কি সওয়াব পাবে? তিনি বললেন, ‘সে যদি তা হারাম পথে পূরণ করত, তবে কি তার গুনাহ হতো না? তেমনি সে যখন হালাল পথে তা পূরণ করে, তখন তার জন্য সওয়াব রয়েছে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১০০৬)


১২. একে অপরের জন্য দোয়া করা


নবদম্পতির উচিত শুধু নিজেদের সুখের জন্য নয়, একে অপরের ঈমান, চরিত্র, রিজিক, স্বাস্থ্য ও আখিরাতের সফলতার জন্য দোয়া করা। মহান আল্লাহ তার নেক বান্দাদের একটি দোয়া উল্লেখ করেছেন, ‘হে আমাদের রব! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের আমাদের চোখের শীতলতা দান করুন এবং আমাদের মুত্তাকিদের জন্য আদর্শ বানান।’ (সুরা : ফুরকান, আয়াত : ৭৪)


নবদম্পতির জন্য আমাদের করণীয়


একটি সুন্দর দাম্পত্য জীবন শুধু একটি দিনের আয়োজনের ওপর নির্ভর করে না; বরং প্রতিদিনের ইবাদত, ধৈর্য, ভালোবাসা, ক্ষমাশীলতা এবং আল্লাহর আনুগত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়। তাই নবদম্পতির জন্য আন্তরিকভাবে দোয়া করুন—


১.আল্লাহ তাদের সংসারে ভালোবাসা ও রহমত দান করুন।

২.তাদেরকে নেক সন্তান দান করুন।

৩.তাদের ঘরকে দ্বীনের আলোয় আলোকিত করুন।

৪.পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ধৈর্য ও ক্ষমাশীলতার মাধ্যমে তাদের জীবনকে সুখময় করে তুলুন।


বিয়ে যত সহজ হবে, ততই তা বরকতময় হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। আর নবদম্পতির জন্য সর্বোত্তম শুভেচ্ছা হলো রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো এই দোয়া। তাই আমরা কুসংস্কার, অশালীন রীতি বা প্রচলিত আনুষ্ঠানিক বাক্যের পরিবর্তে সুন্নাহর এই দোয়াটির প্রচলন করি।


আসুন, প্রতিটি বিয়েকে সুন্নাহর আলোয় আলোকিত করি, অপচয়মুক্ত রাখি এবং প্রতিটি নবদম্পতির জন্য আন্তরিকভাবে এই দোয়া করি—


بَارَكَ اللَّهُ لَكَ، وَبَارَكَ عَلَيْكَ، وَجَمَعَ بَيْنَكُمَا فِي خَيْرٍ


উচ্চারণ: ‘বারকাল্লাহু লাকা, ওয়া বারকা আ’লাইকা, ওয়া জামাআ’ বাইনাকুমা ফি খাইরিন।’


অর্থ: ‘আল্লাহ তোমাকে বরকত দান করুন, তোমার ওপর বরকত নাজিল করুন এবং তোমাদের উভয়কে কল্যাণের সঙ্গে একত্রে রাখুন।’  আমিন।


শেয়ার করুন