০৭ জুন ২০২৬, রবিবার, ১১:০৬:২৫ পূর্বাহ্ন
দেশের বিভিন্ন জেলার সীমান্তে পুশইন যেভাবে প্রতিরোধ করছে বিজিবি
  • আপডেট করা হয়েছে : ০৭-০৬-২০২৬
দেশের বিভিন্ন জেলার সীমান্তে পুশইন যেভাবে প্রতিরোধ করছে বিজিবি

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) দেশের বিভিন্ন জেলার সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) পুশইন বা অবৈধ অনুপ্রবেশের একাধিক চেষ্টা অত্যন্ত সফলভাবে প্রতিহত করে চলেছে।



সাম্প্রতিক দিনগুলোতে দেশের উত্তর-পশ্চিম ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সীমান্ত এলাকাগুলোতে বিএসএফ ছোট ছোট গ্রুপে বিভক্ত করে ‘বাংলায় কথা বলা’ লোকদের জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে বিজিবির কঠোর অবস্থান ও স্থানীয় জনগণের সম্মিলিত প্রতিরোধের মুখে বিএসএফের এসব অপচেষ্টা বারবার ভেস্তে যাচ্ছে।


প্রতিবেশী ভারত থেকে ‘বাংলায় কথা বলে’ এমন লোকদের বাংলাদেশে জোর করে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা (পুশইন) অব্যাহত রয়েছে।


দেশটির সীমান্তরক্ষা বাহিনী বিএসএফ সীমান্তবর্তী বিভিন্ন জেলায় ছোট ছোট গ্রুপে এমন লোকদের নিয়ে এসে কাঁটাতারের বেড়ার গেট খুলে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। অবশ্য বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষা বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) একের পর এক পুশইন প্রতিহত করে চলেছে।


বিজিবি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত শুক্রবার রাত ও গতকাল শনিবার ভোরে অন্তত ৮টি জেলায় সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে প্রায় ১০০ লোককে পুশইন করার ভারতীয় চেষ্টা ঠেকিয়ে দেওয়া হয়েছে।


এ বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান হলো, কাউকে সীমান্ত পথে অন্য দেশে ঠেলে দেওয়ার আগে তার পরিচয় যাচাই করে নিতে হয়। পাসপোর্টসহ জাতীয়তা নিশ্চিত করতে হয়। কিন্তু বিএসএফ কোনোরকম যাচাই-বাছাই না করে ছোট ছোট দলে নারী, পুরুষ ও শিশুদের সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে। প্রতিটি স্থানে বিজিবি কর্মকর্তারা বিএসএফকে এ বার্তাই দিচ্ছেন যে, পরিচয় নিশ্চিত না করে কাউকে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।


পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম ঢাকায় সাংবাদিকদের জানান, নাগরিকত্ব যাচাই না করে জোরপূর্বক পুশইন বন্ধ করতে ভারতকে অনুরোধ করা হয়েছে।


এমন পরিস্থিতির ভেতর আগামীকাল সোমবার ভারতের রাজধানী দিল্লিতে বিজিবি-বিএসএফ ‘সম্মেলনে’ বসছে। দুই বাহিনীর মহাপরিচালক-পর্যায়ে বৈঠকটি হবে। সম্মেলনে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে জানান, সেখানে সীমান্তে বেআইনিভাবে পরিচয় ও জাতীয়তা নিশ্চিত না করে ঠেলে দেওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তোলা হবে।


বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকীর নেতৃত্বে ১৫ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল ৪ দিনব্যাপী এ সম্মেলনে অংশ নেবে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, ভূমি রেকর্ড অধিদপ্তর ও যৌথ নদী কমিশনের প্রতিনিধিরা প্রতিনিধিদলে থাকবেন।


বিএসএফ মহাপরিচালক প্রবীণ কুমার ভারতীয় প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন।


বার্ষিক এ সম্মেলনটি দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত ব্যবস্থাপনার সর্বোচ্চ পর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে। সেখানে সীমান্ত হত্যাকা-, অবকাঠামো নির্মাণ, টহল ব্যবস্থা, মাদক ও চোরাচালান নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন বিষয় আলোচনায় আসবে।


চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পঞ্চগড়, নওগাঁ, ঠাকুরগাঁও, মেহেরপুর, ময়মনসিংহ, হাকিমপুর (দিনাজপুর) থেকে দেশ রূপান্তর প্রতিনিধিরা জানান, পুশইন ঠেকাতে স্থানীয়পর্যায়ে বিজিবি বেশ তৎপর আছে। বিভিন্ন বিওপিতে জনবল বৃদ্ধি করা হয়েছে।


পুশইনের সম্ভাব্য এলাকাগুলোতে ২৪ ঘণ্টা টহল জোরদার করা হয়েছে। পুশইনে সহায়তা দিতে বাংলাদেশ থেকে দালালসহ কেউ তৎপর আছে কি না, তাদের চিহ্নিত করার উদ্যোগ নিয়েছে বিজিবি। অনেক স্থানে স্থানীয় জনগণ বিজিবিকে সহায়তা দিতে এগিয়ে যাচ্ছে।


চাঁপাইনবাবগঞ্জ: গোমস্তাপুরের বাঙ্গাবাড়ি সীমান্তে বিজিবির প্রতিরোধের মুখে দুই দিন ধরে ২৮ নারী, পুরুষ ও শিশুকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। দুই দিন খোলা আকাশের নিচে অবস্থানের পর গতকাল ভোরে তাদের সরিয়ে নেওয়া হয়। তবে, স্থানটিতে তাদের পোশাকসহ বিভিন্ন সামগ্রী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। বিএসএফ অবশ্য এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কিছু জানায়নি।


বিজিবি ১৬ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম মাসুম জানান, পুশইনের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় তাদের ভারতের অভ্যন্তরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।


এদিকে পুশইন ঠেকাতে বিজিবিকে সহায়তা দিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আনসার-ভিডিপি) সদস্যদের বলা হয়েছে।


গতকাল আনসার সদর দপ্তরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সীমান্তের ভৌগোলিক অবস্থান ও চোরাপথগুলো সম্পর্কে স্থানীয়দের ধারণা সবচেয়ে বেশি থাকে। এ কারণে স্থানীয়পর্যায়ে আনসার-ভিডিপি সদস্যদের নিয়ে বিশেষ টিম গঠন করে দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিজিবি চাইলে এবং সীমান্তে যেকোনো সন্দেহজনক গতিবিধি দেখামাত্র আনসার-ভিডিপি সদস্যরা সহায়তা করবেন।


নওগাঁ : বিজিবির শক্ত অবস্থানের মুখে সাপাহার সীমান্ত এলাকার শূন্য রেখায় থাকা নারী, পুরুষ ও শিশুসহ ১৭ জনকে ১৯ ঘণ্টা অবস্থান করানোর পর বিএসএফ শুক্রবার মধ্যরাতে ফিরিয়ে নিয়েছে। তাদের মধ্যে ছিলেন ছয়জন পুরুষ, ছয়জন নারী এবং পাঁচ শিশু।


প্রত্যক্ষদর্শী কলমুডাঙ্গা গ্রামের মাহবুব আলম বলেন, পুশইনের জন্য আনা ১৭ জনকে বিজিবি পাহারা দিয়ে রেখেছিল। এরপর বিএসএফ তাদের ভারতে নিয়ে যায়। তারা বিএসএফ সদস্যদের সঙ্গে যেতে চাচ্ছিল না।


নওগাঁ ব্যাটালিয়ন ১৬ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম মাসুম বলেন, মানবিক বিবেচনায় শুরুতে শূন্য লাইনে থাকতে দিলেও সন্ধ্যার পর তাদের নোম্যান্সল্যান্ডে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। শুক্রবার রাত ১টার দিকে বিএসএফ সীমান্তের লাইট বন্ধ করে দেয়। তারা পুশইনের চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে যাদের এনেছিল, রাতের আঁধারে তাদের ফিরিয়ে নিয়েছে বলে ধারণা করা যাচ্ছে।


ঠাকুরগাঁও : হরিপুর সীমান্ত দিয়ে শনিবার ভোরে ১১ জনকে বাংলাদেশে পুশইন করার চেষ্টা করে বিএসএফ। তাদের মধ্যে তিনজন পুরুষ, চারজন নারী ও চারজন শিশু ছিলেন। খবর পেয়ে বিজিবি দ্রুত সীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থান নেয় এবং বাংলাদেশে প্রবেশে বাধা দেয়। বর্তমানে ওই ব্যক্তিরা শূন্যরেখার ওপারে ভারতের অভ্যন্তরে অবস্থান করছে।


দিনাজপুর ৪২ বিজিবি অধিনায়ক লে. কর্নেল আব্দুল্লাহ আল মঈন হাসান বলেন, সীমান্ত সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থা জারি করা হয়েছে। অতিরিক্ত জনবল মোতায়েনের পাশাপাশি টহল কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ে পতাকা বৈঠক হচ্ছে।


মেহেরপুর : তেঁতুলবাড়িয়া সীমান্তে বিএসএফ কাঁটাতারের বেড়া খুলে ছয়জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়। তাদের মধ্যে তিনজন পুরুষ, দুজন নারী ও একজন শিশু। তারা হেঁটে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে প্রবেশের চেষ্টা করেন। বিজিবি ও গ্রামবাসীর প্রতিরোধের মুখে তারা কাঁটাতারের বেড়ার পাশে ভারতীয় ভূখণ্ডে অবস্থান নেন। তাদের কাঁটাতারের বেড়ার ওপারে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য বিজিবি বারবার হ্যান্ডমাইকে আহ্বান জানায়।


কুষ্টিয়া ৪৭ বিজিবির সহকারী পরিচালক নুরুল হুদা বলেন, অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং পুশইন করতে দেওয়া হবে না।


হিলি (দিনাজপুর): জেলার হাকিমপুরের হিলি সীমান্ত দিয়ে পাঁচজন ভারতীয় নাগরিককে শনিবার ভোরে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে বিএসএফ। বিজিবি শক্ত অবস্থান নিয়ে তা রুখে দিয়েছে। স্থানীয় গ্রামবাসী বিজিবিকে সহযোগিতা করেছেন।


জয়পুরহাট-২০ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল লতিফুল বারী জানান, কোনো পুশইন হয়নি। সীমান্ত এলাকায় গোয়েন্দা সংস্থার পাশাপাশি বিজিবি নজরদারি করছে। সীমান্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।


পঞ্চগড় : বড়বাড়ী সীমান্ত দিয়ে ভারতে বসবাসকারী ১০ জন নারী, পুরুষ ও শিশুকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে বিএসএফ। বিজিবি তাদের গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়।


শেয়ার করুন