০৭ এপ্রিল ২০২৬, মঙ্গলবার, ০৫:৫২:২৫ পূর্বাহ্ন
ছুটি ছাড়া অনুপস্থিত ও আন্দোলনে উস্কানি দিলে চাকরি হারানোর ঝুঁকি
  • আপডেট করা হয়েছে : ০৫-০৪-২০২৬
ছুটি ছাড়া অনুপস্থিত ও আন্দোলনে উস্কানি দিলে চাকরি হারানোর ঝুঁকি

অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে রাষ্ট্রপতির জারিকৃত মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে যেই ৯৮টি হুবহু বিল আকারে সংসদে পাশ করার জন্য বিশেষ কমিটি সুপারিশ করেছে এরমধ্যে অন্যতম ‘সরকারি চাকরি (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী ১০ এপ্রিলের মধ্যেই পাশ হচ্ছে এই বিলটি। বিলটি পাশের পর আইনে পরিণত হলে ছুটি ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলে এবং কোনো ধরনের আন্দোলনে উসকানি দিলে চাকরি হারাতে পারেন সরকারি চাকরিজীবীরা।


অধ্যাদেশে সরাসরি ‘সভা-সমাবেশ’ বা ‘আন্দোলন’ শব্দটি না থাকলেও সেটি স্পষ্ট ইঙ্গিত করা হয়েছে। এ ধরনের কিছুতে যোগ দিলে, অন্যকে যোগ দিতে প্ররোচিত করলে, কিংবা ছুটি ছাড়া নিজে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলে এবং অন্যকে কাজে বাধা দিলে সরকার চাইলে চাকরি থেকে বরখাস্তসহ তিন ধরনের শাস্তি দিতে পারবে।


সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে সহজেই শাস্তি, এমনকি চাকরি থেকে বরখাস্তের সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে ‘সরকারি চাকরি (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর খসড়ায় অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ প্রথম অনুমোদন দেয় গত বছরের ২২ মে। এ নিয়ে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দেয় ও কর্মচারীরা আন্দোলনে নামেন। সচিবালয়ে কর্মচারীদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে দেওয়া আশ্বাস অনুযায়ী অন্তর্বর্তী সরকার গত ৩ জুলাই অধ্যাদেশটিতে আবার সংশোধনী আনে।


সরকারি কর্মচারীদের আচরণ ও দণ্ড সংক্রান্ত বিশেষ বিধান সম্পর্কে চূড়ান্ত অধ্যাদেশটির ‘৩৭ক’ ধারায় বলা হয়েছে, ‘এই আইন বা এই আইনের অধীন প্রণীত বিধিমালায় যাহা কিছুই থাকুক না কেন, যদি কোনো সরকারি কর্মচারী (ক) এমন কোনো কার্যে লিপ্ত হন, যাহা অনানুগত্যের শামিল বা যাহা অন্য যেকোনো সরকারি কর্মচারীর মধ্যে অনানুগত্য সৃষ্টি করে বা শৃঙ্খলা বিঘ্নিত করে বা কর্তব্য সম্পাদনে বাধার সৃষ্টি করে, অথবা (খ) অন্যান্য কর্মচারীদের সহিত সমবেতভাবে বা এককভাবে, ছুটি ব্যতীত বা কোনো যুক্তিসংগত কারণ ব্যতীত, নিজ কর্ম হইতে অনুপস্থিত বা বিরত থাকেন বা কর্তব্য সম্পাদনে ব্যর্থ হন, অথবা (গ) অন্য যেকোনো কর্মচারীকে তাহার কর্ম হইতে অনুপস্থিত থাকিতে বা বিরত থাকিতে বা তাহার কর্তব্য পালন না করিবার নিমিত্ত উস্কানি দেন বা প্ররোচিত করেন, অথবা (ঘ) যেকোনো সরকারি কর্মচারীকে তাহার কর্মে উপস্থিত হইতে বা কর্তব্য সম্পাদনে বাধাগ্রস্ত করেন, তাহা হইলে উহা হইবে একটি অসদাচরণ এবং তজ্জন্য তিনি বর্ণিত যেকোনো দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।’


শাস্তির বিষয়ে অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, নিম্নপদ বা নিম্নবেতন গ্রেডে অবনমিতকরণ, চাকরি থেকে অপসারণ এবং চাকরি থেকে বরখাস্ত। তবে, শাস্তি নির্ধারণের আগে অপরাধ নির্ধারণ করে অভিযোগ গঠন এবং অভিযুক্তকে কারণ দর্শাও নোটিশ দেওয়ার বিধান রাখা আছে। এছাড়া, শাস্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তির আপিল করার সুযোগও রাখা হয়েছে অধ্যাদেশে।


প্রসঙ্গত, অন্তর্বর্তী সরকার এসংক্রান্ত অধ্যাদেশে প্রথম সংশোধনীতে অনুমোদিত ছুটি ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলে কারণ দর্শাও নোটিশ ছাড়াই শাস্তি দেওয়ার বিধান যুক্ত করেছিল। এ নিয়ে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ ও আন্দোলন দেখা দিলে পরে কারণ দর্শাও নোটিশ দেওয়ার বিধান যুক্ত করা হয়।


সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশও হুবহু পাশ হচ্ছে, সাইবার


নিরাপত্তা আইনের সব মামলা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে


বিশেষ কমিটি ‘সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫’ও হুবহু বিল আকারে সংসদে উত্থাপন করে পাশের সুপারিশ করেছে। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বহুল বিতর্কিত সাইবার নিরাপত্তা আইন বাদ দিয়ে নতুন করে ‘সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ’ প্রণয়ন করছিল অন্তর্বর্তী সরকার। অনেক দিন ধরে এনিয়ে আলোচনা ও বারবার খসড়া পরিবর্তনের পর গত বছরের ৬ মে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ ‘সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ’-এর খসড়া অনুমোদন করে। এতে সাইবার নিরাপত্তা আইনের বিতর্কিত ৯টি ধারা বাদ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, সাইবার নিরাপত্তা আইনে হওয়া সকল মামলা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাদ হয়ে যাবে বলেও উল্লেখ করা হয়।


এই অধ্যাদেশে প্রথম বারের মতো ইন্টারনেটকে নাগরিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। অনলাইন জুয়া নিষিদ্ধের প্রস্তাবও রয়েছে। ধর্মীয় উসকানিমূলক বক্তব্য বা কনটেন্ট, যেটি সহিংসতা উসকে দিতে পারে, সেটিকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে অধ্যাদেশে রাখা হয়েছে। এছাড়া, অধ্যাদেশে সাইবার জগতে নারী ও শিশু নির্যাতন এবং যৌন হয়রানিকেও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।


সাইবার নিরাপত্তা আইনের মানহানিকর তথ্য প্রকাশ, প্রচার, ইত্যাদি সংক্রান্ত ধারাও সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়েছে। কিছু কিছু ধারা পরিবর্তন করা হয়েছে। স্পিচ অফেন্স-সম্পর্কিত বা কথা বলে বা মতপ্রকাশের অপরাধের ক্ষেত্রে দুটি অপরাধ  অধ্যাদেশে রাখা হয়েছে। এরমধ্যে একটি হলো নারী ও শিশুর প্রতি যৌন নির্যাতনমূলক কনটেন্ট প্রকাশ ও হুমকি দেওয়া। আরেকটি হলো ধর্মীয় ঘৃণা ছড়ানোর মধ্য দিয়ে সহিংসতাকে উসকে দেওয়া। তবে ধর্মীয় ঘৃণাকে সুনির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, যাতে ভুল বোঝাবুঝি না হয় এবং কেউ কাউকে হয়রানি করতে না পারে। ধর্মীয় উসকানিমূলক বক্তব্য বা যেকোনো কনটেন্ট, যেটি সহিংসতা উসকে দিতে পারে, সেটিকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করা হয়েছে।


সংশোধন হচ্ছে সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশ, এই আইনেই আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার


সংসদের বিশেষ কমিটি যে ১৫টি অধ্যাদেশে সংশোধনী এনে বিল আকারে চলতি অধিবেশনেই পাশের সুপারিশ করেছে এরমধ্যে অন্যতম ‘সন্ত্রাস বিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’। গত বছরের ১১ মে এই অধ্যাদেশটি জারি করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। এতে ২০০৯ সালের ১৬ নম্বর আইনের ২০ নম্বর ধারায় সংশোধনী আনা হয়। এই সংশোধনীতে বলা হয়েছে, ‘উক্ত সত্তা কর্তৃক বা উহার পক্ষে বা সমর্থনে যে কোন প্রেস বিবৃতির প্রকাশনা বা মুদ্রণ কিংবা গণমাধ্যম, অনলাইন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা অন্য যে কোন মাধ্যমে যে কোন ধরনের প্রচারণা, অথবা মিছিল, সভা-সমাবেশ বা সংবাদ সম্মেলন আয়োজন বা জনসম্মুখে বক্তৃতা প্রদান নিষিদ্ধ করিবে।’


বিশেষ কমিটি অধ্যাদেশটিতে সংশোধনী এনে শাস্তির বিধান যুক্ত করার সুপারিশ করেছে। এই অধ্যাদেশ বলেই ২০০৯ সালের সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ১৮ এবং ২০ ধারা সংশোধন করে গত বছর আওয়ামী লীগ ও এর সব সহযোগী-অঙ্গসংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে অন্তর্বর্তী সরকার। এই আইনেই ২০২৪ সালের অক্টোবরে নিষিদ্ধ করা হয় ছাত্রলীগকে।


আগের আইনে বলা ছিল, নিষিদ্ধ সংগঠন উল্লিখিত কার্যক্রম পরিচালনা করলে চার থেকে ১৪ বছর কারাদণ্ড হতে পারে। তবে, অধ্যাদেশে বলা হয়নি কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন সভা-সমাবেশ করলে কী শাস্তি হবে। ফলে এতদিন আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকলেও নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার শাস্তির বিধান ছিল না।


শেয়ার করুন