৩০ মে ২০২৬, শনিবার, ১২:৪১:১৮ অপরাহ্ন
মরুভূমিতে চীনের ‘পারমাণবিক দুর্গ’ : নতুন উদ্বেগে যুক্তরাষ্ট্র
  • আপডেট করা হয়েছে : ৩০-০৫-২০২৬
মরুভূমিতে চীনের ‘পারমাণবিক দুর্গ’ : নতুন উদ্বেগে যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য যেকোনো আকস্মিক হামলা থেকে নিজেদের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার সুরক্ষিত রাখতে এক অভিনব কৌশল নিয়েছে চীন। দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের এক প্রত্যন্ত মরুভূমিতে গড়ে তোলা হচ্ছে বিশাল এক সামরিক অবকাঠামো।


রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এটি এমনভাবে তৈরি করা হচ্ছে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সম্ভাব্য প্রথম হামলায় চীনের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার পুরোপুরি ধ্বংস করা সম্ভব না হয় এবং বেইজিং পাল্টা জবাব দেওয়ার সক্ষমতা ধরে রাখতে পারে।


চীনের পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো শহরে আঘাত হানতে সক্ষম। সম্প্রতি রয়টার্সের পর্যালোচনায় আসা কিছু উপগ্রহচিত্রে (স্যাটেলাইট ইমেজ) চীনের এই গোপন ও সুবিশাল সামরিক তৎপরতার চিত্র স্পষ্ট হয়েছে।


উপগ্রহচিত্রে দেখা গেছে, পূর্ব সিনচিয়াং অঞ্চলের হামি পারমাণবিক সাইলো (ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণাগার) এলাকাকে কেন্দ্র করে হাজার হাজার বর্গকিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত এক সামরিক নেটওয়ার্ক তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো—বিশাল আকৃতির তিনটি অষ্টভুজাকৃতির স্থাপনা।


উত্তরের অষ্টভুজটি সেনা সদস্যদের থাকার ব্যবস্থা, সামরিক যান এবং ছদ্মবেশী ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণস্থলের এক জটিল সংমিশ্রণ। এর আশপাশে বাঙ্কার, আধুনিক অস্ত্রভাণ্ডার, বিমানঘাঁটি ও রেলসংযোগ রয়েছে, যা সরাসরি মূল পারমাণবিক সাইলোর সঙ্গে যুক্ত।


দক্ষিণের অষ্টভুজে শক্তিশালী বাঙ্কার ও ফুয়েল ডিপো বা জ্বালানি সংরক্ষণাগারের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে।


তৃতীয় অষ্টভুজটি লপ নুর পারমাণবিক পরীক্ষাকেন্দ্রের দক্ষিণে অবস্থিত এই স্থাপনাটি সম্ভবত মহড়ার ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সেখানে পশ্চিমা যুদ্ধবিমানের আদলে তৈরি বেশ কিছু নকল বিমানও দেখা গেছে।


মরুভূমির পাহাড়ি পাথর ও শুকনো খালের আড়ালে কংক্রিটের তৈরি ৮০টিরও বেশি মোবাইল লঞ্চ প্যাড বা উৎক্ষেপণকেন্দ্র শনাক্ত করা হয়েছে। এগুলো মূলত সড়কপথে চলাচলকারী আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য তৈরি করা হয়েছে।


কমান্ড ও যোগাযোগের জন্য পুরো মরুভূমিজুড়ে মাটির নিচে বিছানো হয়েছে ফাইবার অপটিক কেবল। সেই সঙ্গে শক্তিশালী স্যাটেলাইট ডিশ ও বিশাল টাওয়ারের মাধ্যমে একটি নিটোল ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ও স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে।


চীনের আনুষ্ঠানিক নীতি হলো—তারা কখনোই প্রথমে পারমাণবিক হামলা চালাবে না। তবে তাদের মূল লক্ষ্য হলো, আক্রান্ত হলে যেন শতভাগ শক্তির সঙ্গে পাল্টা জবাব দেওয়া যায়।


বিশ্লেষকদের মতে, এই সামরিক আধুনিকায়ন মূলত তাইওয়ান সংকটকে সামনে রেখে করা হচ্ছে। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং সতর্ক করে বলেছিলেন, তাইওয়ান ইস্যুতে দুই দেশের ভুল বোঝাবুঝি পরিস্থিতিকে ‘বিপজ্জনক জায়গায়’ নিয়ে যেতে পারে।


পশ্চিমা কূটনীতিকদের ধারণা, তাইওয়ান ইস্যুতে বাইরের দেশের (বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের) হস্তক্ষেপ থামাতে চীন এই পারমাণবিক শক্তিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।


যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের তথ্য অনুযায়ী, চীন বিশ্বের যেকোনো দেশের চেয়ে দ্রুতগতিতে তাদের পারমাণবিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে।


ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩০ সালের মধ্যে চীনের কাছে অন্তত এক হাজার পারমাণবিক ওয়ারহেড থাকবে।


চীন তার ‘হুয়োইয়ান-১’ উপগ্রহব্যবস্থার মাধ্যমে শত্রুর ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের মাত্র ৯০ সেকেন্ডের মধ্যে তা শনাক্ত করতে পারে। ফলে মূল হামলা আঘাত হানার আগেই চীন পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে দিতে সক্ষম।


যুক্তরাষ্ট্র বা রাশিয়া সাধারণত তাদের পারমাণবিক সুরক্ষার জন্য কেবল সাইলোর ভৌগোলিক দূরত্ব ও কংক্রিটের মজবুত কাঠামোর ওপর নির্ভর করে। কিন্তু চীন যেভাবে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং বিশাল যোগাযোগ নেটওয়ার্কের এক মহাপরিকল্পনা মরুভূমিতে বাস্তবায়ন করছে, তা সম্পূর্ণ নজিরবিহীন।


ফেডারেশন অব আমেরিকান সায়েন্টিস্টসের পারমাণবিক তথ্য প্রকল্পের পরিচালক হ্যানস ক্রিস্টেনসেন বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ‘এত প্রতিকূল পরিবেশে এত বড় অবকাঠামো আমি এর আগে কখনো দেখিনি। এটি সত্যিই চীনের এক অসাধারণ প্রচেষ্টা।’


শেয়ার করুন