১৭ জানুয়ারী ২০২৬, শনিবার, ০৫:১৩:৫৮ অপরাহ্ন
মার্কিন ভিসা নীতিতে সংকট বাড়ছে বাংলাদেশের
  • আপডেট করা হয়েছে : ১৭-০১-২০২৬
মার্কিন ভিসা নীতিতে সংকট বাড়ছে বাংলাদেশের

ভিসা নীতি নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একের পর এক সিদ্ধান্তে সংকট বাড়ছে বাংলাদেশের। যদিও নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র সফরের পর সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, অত্যন্ত ফলপ্রসু হয়েছে বৈঠক। সেই বক্তব্যের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতির প্রয়োগে। 


সর্বশেষ যে ৭৫টি দেশের অভিবাসী ভিসা প্রক্রিয়া বন্ধ করা হয়েছে তার মধ্যে বাংলাদেশও আছে। এর আগে বি-১ ও বি-২ ভিসার ক্ষেত্রে ৩৮টি দেশের জন্য ৫ থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ‘বন্ড সিস্টেম' চালু করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সেই তালিকাতেও রয়েছে বাংলাদেশ। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে সংকট বেড়েই চলেছে বাংলাদেশের।


সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমেদ ডয়চে ভেলেকে বলেন, এই সরকার যখন ক্ষমতা নেয়, তখন আমরা শুনেছিলাম এরা যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু, ফলে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমরা অনেক সুযোগ-সুবিধা পাবো। কিন্তু আমরা তো উল্টো ফল দেখতে পাচ্ছি। কয়েকদিন আগে আমাদের নিরাপত্তা উপদেষ্টা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে বৈঠক করে এলেন। শুনলাম ভালো বৈঠক হয়েছে, আর কোনো অসুবিধা হবে না। অথচ এখন আরো খারাপ খবর এলো। এখন মনে হচ্ছে, রাষ্ট্রের টাকায় কিছু মানুষ অযথা বিদেশ ভ্রমণ করছেন। এতে কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। তাই আমি মনে করি, এই সরকারের আর কোনো বিষয়েই কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার কোনো দরকার নেই। কয়েকদিন পরই নির্বাচন হবে, তখন নির্বাচিত সরকার এ বিষয়ে উদ্যোগ নেবেন। এখন এরা উদ্যোগ নিতে গেলে আরো বিপদ বাড়তে পারে। তাই এদের চুপচাপ থাকাই ভালো। 


৭৫ দেশের অভিবাসী ভিসার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সিদ্ধান্ত


বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ভুটানসহ ৭৫টি দেশের অভিবাসী ভিসা দেওয়ার প্রক্রিয়া স্থগিত করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। গত বুধবার ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের এমন সিদ্ধান্তের কথা জানায় দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ২১ জানুয়ারি থেকে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করা শুরু হওয়ার কথা। ৭৫টি দেশের তালিকায় রাশিয়া, ইরান, থাইল্যান্ড, ব্রাজিল, কুয়েত, সোমালিয়া, নাইজেরিয়া, ইয়েমেন এবং ইরাকও রয়েছে। 


মার্কিন পররাষ্ট মন্ত্রণালয় এক্স-এর এক পোস্টে জানিয়েছে, যেসব দেশের অভিবাসীরা যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের কল্যাণভাতা অগ্রহণযোগ্য হারে নিয়ে থাকে, এমন ৭৫টি দেশের অভিবাসী ভিসার প্রক্রিয়া পররাষ্ট্র দপ্তর স্থগিত রাখবে। নতুন অভিবাসীরা মার্কিন জনগণের সম্পদে ভাগ বসাবে না-  যুক্তরাষ্ট্র এ বিষয়ে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত স্থগিতের এ আদেশ কার্যকর থাকবে। মার্কিন প্রশাসন যদি মনে করে, আবেদনকারী ব্যক্তি সরকারি কল্যাণভাতা বা অন্যান্য সরকারি সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠতে পারেন, তাহলে তার ভিসা প্রত্যাখ্যান করতে পারে।


মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগট এক বিবৃতিতে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের উদারতার সুযোগ নিয়ে যারা সরকারি সহায়তার বোঝা হয়ে উঠতে পারে, তাদের সম্ভাব্য অভিবাসী হিসেবে অযোগ্য  ঘোষণার ক্ষেত্রে পররাষ্ট্র দপ্তর তার দীর্ঘদিনের ক্ষমতা প্রয়োগ করবে। অভিবাসন প্রক্রিয়া পুনর্মূল্যায়ন না হওয়া পর্যন্ত এই ৭৫টি দেশ থেকে অভিবাসন স্থগিত থাকবে।


এনআরবি ওয়ার্ল্ড-এর প্রতিষ্ঠাতা, মার্কিন নাগরিক এনামুল হক এনাম ডয়চে ভেলেকে বলেন, এই সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই ভালো হয়নি। এতে যুক্তরাষ্ট্রও সংকটে পড়বে। কারণ, সেখানে জনবলের অত্যন্ত সংকট রয়েছে। আপনি যে প্রতিষ্ঠানেই যাবেন, সেখান থেকেই বলা হবে, জনবল সংকটে তারা ঠিকভাবে কাজ করতে পারছেন না। এখন অভিভাসন ভিসা বন্ধ হলে জনবল সংকট আরো বাড়বে। তবে এই সিদ্ধান্ত দীর্ঘস্থায়ী হবে বলে মনে হয় না।


৩৮ দেশের জন্য ‘ভিসা বন্ড'


যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের আবেদনের ক্ষেত্রে যেসব দেশের নাগরিকদের অবশ্যই ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ‘ভিসা বন্ড' বা জামানত দিতে হবে, সে দেশগুলোর তালিকা প্রায় ৩ গুণ বাড়িয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ভ্রমণবিষয়ক ওয়েবসাইটে গত মঙ্গলবার এ তথ্য জানানো হয়। গত বছরের আগস্টে প্রথমে ভিসা বন্ডের শর্তযুক্ত দেশের তালিকায় ছয়টি দেশের নাম যুক্ত করে যুক্তরাষ্ট্র। পরে তারা আরো সাতটি দেশকে এই তালিকায় যুক্ত করে। এক সপ্তাহ পার হওয়ার আগেই বাংলাদেশসহ আরও ২৫টি দেশের নাম যোগ করলো যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ওয়েবসাইটে বলা হয়, বন্ডের সর্বোচ্চ পরিমাণ হবে ১৫ হাজার মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় তা প্রায় ১৮ লাখ ৩৫ হাজার টাকা (প্রতি ডলার ১২২.৩১ টাকা হিসেবে)। 


মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নতুন করে যুক্ত হওয়া দেশগুলোর জন্য (কয়েকটি ছাড়া) এ বন্ডের শর্ত ২১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হবে। এ সিদ্ধান্তের ফলে মোট ৩৮টি দেশ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হলো। এসব দেশের বেশির ভাগই আফ্রিকার। তবে লাতিন আমেরিকা ও এশিয়ার কয়েকটি দেশও রয়েছে। নতুন নিয়মের ফলে অনেক নাগরিকের জন্যই এখন মার্কিন ভিসা পাওয়া অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে পড়বে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ক্ষেত্রে ইতিমধ্যে আরোপিত কড়াকড়ি আরো জোরালো করতে ট্রাম্প প্রশাসনের নেওয়া সর্বশেষ পদক্ষেপ এটি।


নতুন নিয়ম অনুযায়ী, যেসব দেশের নাগরিকদের মার্কিন ভিসার প্রয়োজন হয়, তাদের সবাইকে সশরীরে সাক্ষাৎকারে অংশ নিতে হবে। এ ছাড়া তাদের গত কয়েক বছরের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টের ইতিহাস এবং নিজেদের ও পরিবারের সদস্যদের আগের ভ্রমণ ও বসবাসের বিস্তারিত তথ্য জানানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত এ ‘ভিসা বন্ড' বা জামানতের বিষয়টিকে সমর্থন করেছেন। তাদের দাবি, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নাগরিকেরা যাতে ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর অতিরিক্ত সময় অবস্থান না করেন, সেটি নিশ্চিত করতে এ পদ্ধতি কার্যকর ভূমিকা রাখবে।  


তবে এ জামানত জমা দিলেই যে ভিসা পাওয়া নিশ্চিত হবে, তা নয়। যদি ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয় বা ভিসা পাওয়া ব্যক্তি ভিসার সব শর্ত মেনে চলেন, তবে ওই অর্থ ফেরত দেওয়া হবে। এসব দেশের ইস্যু করা পাসপোর্ট নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণে ইচ্ছুক কেউ যদি বি১/বি২ (ভ্রমণ ও ব্যবসা) ভিসার জন্য যোগ্য বিবেচিত হন, তবে তাকে অবশ্যই ৫ হাজার, ১০ হাজার, কিংবা ১৫ হাজার ডলারের বন্ড জমা দিতে হবে। 


পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, বন্ডের এ অর্থের পরিমাণ ভিসা সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করা হবে। আবেদনকারীকে মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের ‘আই-৩৫২' ফর্মও জমা দিতে হবে। এ ছাড়া আবেদনকারীদের মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের অনলাইন পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম ‘pay.gov'-এর মাধ্যমে বন্ডের শর্তাবলীতে সম্মত হতে হবে। ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা হয়, ভিসা পাওয়া ব্যক্তিদের নির্দিষ্ট কিছু পথ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ ও বহির্গমন করতে হবে। অন্যথায় তাদের প্রবেশাধিকার প্রত্যাখ্যান করা হতে পারে, অথবা তাদের দেশত্যাগের তথ্য সঠিকভাবে নথিবদ্ধ না হওয়ার ঝুঁকি থাকবে। নির্ধারিত প্রবেশপথগুলোর মধ্যে রয়েছে, বোস্টন লোগান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (বিওএস), জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (জেএফকে) ও ওয়াশিংটন ডুলাস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (আইএডি)।


নতুন বছরের শুরুতে ট্রাম্প প্রশাসনের এ কড়াকড়ি আরোপ বাংলাদেশের জন্য নতুন করে চাপ হিসেবে দেখছেন কূটনৈতিক ও বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, ‘ভিসা বন্ড' হিসেবে জামানত বাংলাদেশিদের যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়াকে নিরুৎসাহিত করবে। 


সিনহুয়া এনুমিলিয়াম ইন্ডাষ্ট্রি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম আফজাল উল মনির ডয়চে ভেলেকে বলেন, ভ্রমণের ক্ষেত্রে জামানত দেওয়া খুবই অসম্মানের। আমি মনে করি, এই তালিকায় বাংলাদেশের নাম থাকাটা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য লজ্জাজনক। ব্যবসায়ীরা হয়ত এই জামানত দিয়ে যেতে পারবেন। কিন্তু যারা ঘুরতে যান, তাদের জন্য তো খুবই খারাপ হলো। ফলে এই ধরনের সিদ্ধান্ত আর যা-ই হোক ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে না। আমাদের জন্য এই সিদ্ধান্ত খারাপ হয়েছে।


তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ-র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল ডয়চে ভেলেকে বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের আরএমজি সেক্টরের জন্য বড় বাজার রয়েছে। এখন ব্যবসা তো একপাক্ষিক না। বায়ারদের এখানে আসতে হয়, আমাদেরও সেখানে যেতে হয়। এভাবেই ব্যবসা চলে। অনেক সময় আমরা না গিয়েও অফিসের কর্মকর্তাদের পাঠিয়ে থাকি। এখন ভিসা বন্ড দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যেতে হলে আমাদের যাওয়া অনেক কমবে। এতে ব্যবসায় নেতিবাচক ফল পড়বে। ফলে, আমি মনে করি, সরকারের উচিত এ ব্যাপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরো নিবিড়ভাবে আলোচনা করে একটা ইতিবাচক সিদ্ধান্তে আসা।


শেয়ার করুন