মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি হওয়ায় তার ছেড়ে আসা ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে ভোট চলছে। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, বৃহস্পতিবার সকাল ৮টায় নির্ধারিত সময়েই এ আসনের ১৮৫টি ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে; তা একটানা বিকাল ৪টা পর্যন্ত চলবে।
ঠাকুরগাঁও সদর, রুহিয়া ও ভুল্লী উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনে মোট ভোটার আছেন ৫ লাখ ১৬ হাজার ১৪০ জন। পাঁচজন প্রার্থীর মধ্যে থেকে এই সংসদীয় এলাকার নতুন জনপ্রতিনিধি বেছে নেবেন তারা।
এই পাঁচ প্রার্থী হলেন— রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ছোট ভাই মির্জা ফয়সল আমিন (ধানের শীষ), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মো. দেলাওয়ার হোসেন (দাঁড়িপাল্লা), বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মো. আবদুল আলীম নিজামী (বটগাছ), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাফেজ মো. খাদেমুল ইসলাম (হাতপাখা) এবং বাংলাদেশ কংগ্রেসের হুসাইন মুহাম্মদ ওমর ফারুক (ডাব)।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, “সুষ্ঠু নির্বাচনের সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দেওয়া হয়েছে। কোনো অভিযোগ পেলেই খতিয়ে দেখা হচ্ছে, হবে। আশা করছি, সংসদ নির্বাচন যেভাবে শান্তিপূর্ণ হয়েছে, এখানেও সেভাবে সুন্দর ভোট হবে।”
১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে এ আসনে ২ লাখ ৩৮ হাজার ৮৩৬ ভোট পেয়ে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন পান ১ লাখা ৪১ হাজার ১৭ ভোট। ৩ হাজার ৯৫১ ভোট পড়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. খাদেমুল ইসলামের বাক্সে।
এই উপ নির্বাচনের আগে প্রায় তিন দশক আগের মাগুরা-২ আসনের উপনির্বাচনের প্রসঙ্গ সামনে এনেছে জামায়াতে ইসলামী।
১৯৯৪ সালের ওই উপনির্বাচনে কারচুপির কারণে যে তৎকালীন বিএনপি সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিল, সে কথাও এখনকার বিএনপি সরকারকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে দলটি।
ঠাকুরগাঁও-১ আসনে ভোটের আগে আচরণবিধি লঙ্ঘন, প্রশাসনের পক্ষপাতিত্বসহ নয় দফা অভিযোগ নির্বাচন কমিশনে জমা দিয়েছে জামায়াত।
দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বুধবার সাংবাদিকদের বলেন, “একটা মাগুরা উপ-নির্বাচন একটা সরকারকে বিদায় করে দিয়েছে। আমরা এ কথা আজ ইলেকশন কমিশনকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছি। ঠাকুরগাঁওয়ে আপনারা আবার মাগুরার স্টাইলে ইলেকশন করতে চান, তাহলে ওই পরিণতির কথা আপনাদের আমরা স্মরণ করিয়ে দিলাম।”
জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য সবশেষ বুধবার সেনা মোতায়েনসহ চার দফা দাবি জানিয়ে এসেছে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে লিখিত দাবির মধ্যে বলা হয়েছে, ভোটগ্রহণ থেকে ফলাফল পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে এবং কোথাও অনিয়ম, কেন্দ্র দখল, ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানো, বাধা, ফল প্রভাবিত করার চেষ্টা করলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে হবে।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ ইসির সঙ্গে বৈঠক শেষে বৃহস্পতিবার বলেন, “আজকের বৈঠকে নির্বাচন কমিশন আমাদের আশ্বস্ত করেছে। কিন্তু কাল ভোটের মাঠে যদি বাস্তবতার সঙ্গে এ আশ্বাসের মিল না পাওয়া যায়, তাহলে ধরে নেব এটি ছিল আইওয়াশ।”
বৃহস্পতিবারের উপ নির্বাচনে ‘নির্বাচন কমিশনের পরীক্ষা হবে’ মন্তব্য করে আযাদ বলেন, “আশা করছি নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনে সক্ষম হবে। এক্ষেত্রে ব্যর্থ হলে ১১ দলীয় জোটের চলমান আন্দোলন আরও জোরদার করা হবে। সারাদেশে আন্দোলন জোরদার হবে।”
বিএনপি ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় ১৯৯৪ সালে মাগুরা-২ আসনে উপনির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ উঠে। এরপর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আন্দোলনের মুখে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি সংবিধানে যোগ করতে বাধ্য হয়েছিল বিএনপি।
বিরোধীদলগুলোর ব্যাপক আন্দোলনের মুখে ১৯৯৬ সালের ২৭ মার্চ সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী এনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের বিল পাস হয় ষষ্ঠ সংসদে।
এরপর ৩০ মার্চ সংসদ ভেঙে দিয়ে সংশোধনী অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে সরকার গঠনের মাত্র ৪৫ দিনের মাথায় পদত্যাগ করে বিএনপি সরকার।
এবার বিএনপিকে সেই মাগুরা-২ আসনের উপনির্বাচন থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন জামায়াতের নেতারা।
১১ দলীয় ঐক্যের নানা অভিযোগ-উদ্বেগের মধ্যে নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদ বুধবার বলেন, নির্বাচনের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে নির্বাচন কমিশন ভবনে একটি মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে। এই সেল থেকে ভোটকেন্দ্রের পরিস্থিতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং ভোটের সার্বিক ব্যবস্থাপনা তদারকি করা হবে।
তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও ভোটকেন্দ্র পর্যবেক্ষণের জন্য এই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বিজিবি, এসআরবি ও পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে মনিটরিং করা হবে। বডিওর্ন ক্যামেরার পাশাপাশি বিজিবি ও পুলিশের বডি ক্যামেরা এবং বিজিবির ড্রোন ব্যবহার করে নজরদারি চালানো হবে।
আখতার আহমেদ বলেন, “এই সার্ভিলেন্স রেখে আমরা এখান থেকে মিনিট বাই মিনিট মনিটরিং করব। নির্বাচন সুষ্ঠু ও সুন্দর হবে। এখন পর্যন্ত উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো কোনো কারণ আমরা পাইনি এবং ইনশাল্লাহ পাব না।”
বিরোধী দলের নালিশের মধ্যে এ উপ-নির্বাচনকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে অভিযোগ খতিয়ে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য আব্দুল আলীম।
তিনি বলেন, “ছোট নির্বাচন হলেও আমাদের মতো দেশে নির্বাচন কমিশনকে সবসময় খুবই সক্রিয় থাকতে হয়। উপ-নির্বাচন দেখে চুপ থাকার সুযোগ নেই। কমিশন সক্রিয় না থাকলে এটাকে কেউ ইস্যু বানিয়ে পুরো রাজনৈতিক পরিস্থিতি অন্যদিকে নিয়ে না যেতে পারে। তাই সাবধান থাকা, সক্রিয় থাকা, সতর্ক থাকা ও মনিটরিং করা প্রয়োজন।”
এ বিশ্লেষক বলেন, “আমাদের দেশে নির্বাচনে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ তো থাকবেই, এটা নতুন কিছু নয়। জাতীয় নির্বাচন, উপনির্বাচন বা স্থানীয় সরকার নির্বাচন, সেটা যাই হোক না কেন। অপজিশনে যারা থাকে, তারা সবসময় অভিযোগ করে, আর সরকারি দল তা আমলে নেয় না।”
এবার মাগুরা-২ উপ নির্বাচনের ‘আঁচ টানাকে’ রাজনৈতিক কৌশল হতে পারে বলে মনে করেন আব্দুল আলীম।
তিনি বলেন, “আমলে নেওয়া না-নেওয়া সরকারি দলের বিষয় হলেও কমিশনের দায়িত্ব হলো অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা। কারণ কেউ যদি এটাকে বড় ইস্যু বানানোর চেষ্টা করে, তবে তার ফল ভিন্ন হতে পারে।”

