০৮ জুলাই ২০২৬, বুধবার, ০৮:২১:০৭ অপরাহ্ন
৭০ বছর ধরে রাজশাহীর বেতশিল্প আঁকড়ে আছেন ফরিদুর, উত্তরসূরি না পেয়ে হতাশা
  • আপডেট করা হয়েছে : ০৮-০৭-২০২৬
৭০ বছর ধরে রাজশাহীর বেতশিল্প আঁকড়ে আছেন ফরিদুর, উত্তরসূরি না পেয়ে হতাশা

একসময় সিলেট থেকে একদল লোক রাজশাহীতে আসেন। নগরের শেখপাড়ায় তাঁরা গড়ে তোলেন বেতপট্টি। কারিগর ও ক্রেতা-বিক্রেতাদের কোলাহলে মুখর হয়ে থাকত পুরো এলাকা। সেটি এখন প্রায় নীরব। সিলেট থেকে আসা সেই দলের সদস্যদের মধ্যে একমাত্র ফরিদুর রহমান বেঁচে আছেন এই শিল্পের জীবন্ত ইতিহাস হয়ে। ৭০ বছর ধরে তিনি বেতশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য লড়াই করে যাচ্ছেন।


মাত্র দেড় বছর বয়সে ফরিদুর রহমান বাবাকে হারান। ১৫ বছর বয়সে হারান মাকেও। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান হওয়ায় পৃথিবীতে আর আপন বলতে কেউ ছিল না। তখন দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়ের হাত ধরে রাজশাহীতে আসেন। সেই আসাটাই হয়ে যায় তাঁর জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ সফর।


রাজশাহীর মাটিতেই গড়েছেন সংসার, ব্যবসা। কিন্তু সিলেট শহরের কাজীবাজারের সেই পৈতৃক ভিটায় আর তাঁর জায়গা হয়নি। এখন তাঁর স্বজন হারিয়ে পাওয়া একমাত্র স্বজন যেন এই বেতশিল্প।


সম্প্রতি শেখপাড়ার সরু রাস্তায় ঢুকতেই চোখে পড়ে বেতের তৈরি চেয়ার, মোড়া, ঝুড়ি আর আয়নার ফ্রেম। তিনটি দোকানের একটিতে পাওয়া যায় ফরিদুর রহমানকে। সেখানে বসেই কথা হয় প্রবীণ এই বেতশিল্পীর সঙ্গে।


দেশের বাড়িতেই বেতের কাজ শিখেছিলেন ফরিদুর। রাজশাহীতে এসে সে দক্ষতাকেই পুঁজি করেন। প্রথম দিকে তৎকালীন রাজশাহী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ও ক্যাডেট কলেজের কিছু কাজের সুযোগ পান। ধীরে ধীরে নিজের শ্রম, দক্ষতা আর সততার ওপর ভর করে গড়ে তোলেন ব্যবসা। একসময় তাঁর অধীনে ২০ থেকে ২২ জন কারিগর কাজ করতেন। শহরের বিভিন্ন জায়গায় ছিল একাধিক দোকান।


বেতপট্টি এলাকায় এখন মাত্র তিনটি দোকানই টিকে আছে। এর মধ্যে একটা ফরিদুর রহমানের। দোকানের চারপাশে ছড়িয়ে আছে কাঁচামাল-বাঁশের কাঠি ও কাঁচা বাঁশ। পেছনে ঝুলছে বিভিন্ন আকারের সুন্দরভাবে তৈরি করা বাঁশের দোলনা বা আরামদায়ক চেয়ার, যা এই শিল্পের বৈচিত্র্য ও নান্দনিকতার প্রমাণ দেয়। বিক্রয়ের জন্য থরে থরে সাজানো আছে আকর্ষণীয় ডিজাইন ও রঙের বৈচিত্র্যময় বাঁশের ঝুড়ি। লাল, সবুজ ও কালো রঙের সংমিশ্রণে তৈরি এই ঝুড়িগুলো ঘরের সৌন্দর্যবর্ধন বা ব্যবহারের জন্য উপযোগী। দীর্ঘদিনের কঠোর পরিশ্রমের ছাপ তাঁর মুখে স্পষ্ট হলেও, তাঁর শান্ত ও গভীর চাহনিতে এখনো টিকে থাকার এক অদ্ভুত মনোবল পরিলক্ষিত হয়।


ফরিদুর রহমানের ভাষ্য, সিলেট নগরের কাজীবাজার এলাকায় তাঁদের বাড়ি ছিল। শহরের কেন্দ্রস্থলের সেই জমির বর্তমান মূল্য এক থেকে দুই কোটি টাকার মতো হতে পারে বলে তাঁর ধারণা। কিন্তু সাত দশক ধরে রাজশাহীতে বসবাসের সুযোগে আত্মীয়স্বজনই ধীরে ধীরে জমিজমা নিজেদের দখলে নিয়ে নেন।


বৃদ্ধ কণ্ঠে কোনো ক্ষোভের চেয়ে ক্লান্তিই বেশি। তিনি বলেন, ‘এখন মামলা-মোকদ্দমা করেও আর কিছু হবে না। এত বছর পরে কাগজপত্রও নাই, সাক্ষীও নাই। যা একটু দুই আনা পাইছি, তাই নিয়াই ফিরে আইছি।’


কথাগুলো বলতে বলতে বৃদ্ধের কণ্ঠ আরও নিচু হয়ে আসে। বয়স যেন তাঁর কণ্ঠস্বরকেও ভারী করে দিয়েছে। কথাগুলো স্পষ্ট শুনতে হলে বারবার তাঁর একেবারে কাছে ঝুঁকে যেতে হয়।


সিলেটে এখন আর তেমন যাওয়া হয় না ফরিদুরের। যেতে চাইলেও হিসাব কষতে হয়। তাঁর হিসাবে, একবার পরিবার নিয়ে গেলে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা খরচ হয়ে যায়। যাতায়াতের ব্যয় তো আছেই, আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে গেলে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের হাতেও কিছু না কিছু তুলে দিতে হয়। সব মিলিয়ে সেই যাত্রা তাঁর মতো বৃদ্ধ মানুষের কাছে এখন বিলাসিতা।


এর চেয়েও বড় কথা, যে বাড়িতে ফেরার জন্য একসময় মন ছটফট করত, সেখানে এখন আর অপেক্ষা করে নেই মা, নেই বাবা, নেই আপন ভাই–বোন। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘মানুষ তো আপন মানুষের টানেই যায়। আমার তো সেই টানটাই আর নাই।’ তাই কাজীবাজারের সেই ভিটে এখন শুধু স্মৃতিতেই আছে। বাস্তবে তাঁর ঠিকানা হয়ে গেছে রাজশাহীর শেখপাড়ার বেতপট্টির ছোট্ট এই দোকান।


ফরিদুর রহমানের সঙ্গে কথার মাঝেই দোকানে ঢোকেন দুই নারী ক্রেতা। তাঁরা কয়েক দিন আগে দুটি ছোট বেতের ঝুঁড়ি বানাতে দিয়েছিলেন। এবার আরও একটি ঝুড়ি নিতে চান। দোকানে রাখা ঝুড়িগুলোর দাম ২৫০ টাকা থেকে শুরু। কিন্তু সেই দুই নারী আগের মতোই ২০০ টাকা করে ঝুড়িটি চান।


ফরিদুর রহমান তাঁদের বোঝানোর চেষ্টা করেন, আগে থেকে তৈরি কোনো ঝুড়ি যখন প্রায় শেষ হয়ে যায় তখন সেগুলো কম দামে দেওয়া যায়; কিন্তু নির্দিষ্ট সময় বেঁধে নতুন করে বানাতে হলে কারিগরকে বাড়তি চাপ নিয়ে কাজ করতে হয়। তাই দামও কিছুটা বাড়ে। কিছুটা দর-কষাকষির পর ক্রেতারা আরও ৫০ টাকা বাড়িয়ে দিতে রাজি হন।


কিছুক্ষণের মধ্যে দোকানে আসেন আরও দুই তরুণী। তাঁদের হাতে একটি নতুন নকশার ছবি। সেই নকশা দেখে একই রকম একটি বেতের সামগ্রী তৈরি করা সম্ভব কি না, জানতে চান তাঁরা। ফরিদুর রহমান ছবিটির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকেন। তারপর মৃদু হেসে মাথা নাড়তে নাড়তে বলেন, ‘এখন আর ওই কাজ করার শক্তি নাই। বয়স হইছে।’ বলেই পাশের দোকানের দিকে যেতে ইশারা করেন।


শেয়ার করুন