০৫ জুন ২০২৬, শুক্রবার, ০১:১২:০৪ অপরাহ্ন
বিদ্যুৎ-জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, জীবনযাত্রা আরো কঠিন হবে: সিপিডি
  • আপডেট করা হয়েছে : ০৫-০৬-২০২৬
বিদ্যুৎ-জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, জীবনযাত্রা আরো কঠিন হবে: সিপিডি

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে দেশে মূল্যস্ফীতির চাপ আরো তীব্র হয়েছে। বুধবার নতুন করে বেড়েছে বিদ্যুতের দাম। ফলে সাধারণ মানুষের পরিবারের খরচ চালানো আরো কঠিন হয়ে যাচ্ছে বলে মনে করেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডি কার্যালয়ে ‘২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ অর্থনীতি :উত্তরণকালীন সময়ে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ’ বিষয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন তিনি। এ সময় সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মুস্তাফিজুর রহমানসহ জেষ্ঠ্য গবেষকরা উপস্থিত ছিলেন।


আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট সামনে রেখে চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতির সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়। এসময় ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। দেশের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা ও বৈশ্বিক নানা ধাক্কার কারণে অর্থনীতি এখনো বেশ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। দেশের অর্থনীতির চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো উচ্চ মূল্যস্ফীতি। গত এপ্রিলে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। মূলত জ্বালানি, পরিবহন ও সেবা খাতের খরচ বৃদ্ধির কারণেই মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির তুলনায় মজুরি বৃদ্ধির হার কম। ফলে সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে সীমিত ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। সিপিডির পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত বছরের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের মে মাসের মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এই সময়ে ডিজেলের দাম ১৫ শতাংশ; পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম প্রায় ২০ শতাংশের মতো বেড়েছে। জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব দ্রুত পরিবহন খাতেও পড়ে। ফলে বাসভাড়া বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশ জুড়ে পণ্য পরিবহন খরচ বেড়ে যায়।


জ্বালানি খরচের পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার ব্যবস্থাপনায় ও সরবরাহ শৃঙ্খলের দুর্বলতাকেও মূল্যস্ফীতির আরেকটি বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সিপিডি। এ বিষয়ে ফাহমিদা খাতুন বলেন, বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের একাধিক স্তর থাকার কারণে প্রায়ই খুচরা পর্যায়ে পণ্যের দাম অনেক বেড়ে যায়। ফলে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার এই সময়ে সাধারণ ভোক্তারা আরো বেশি অসহায় হয়ে পড়েন।


বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী হেলেন মাশিয়াত বলেন, দেশে জ্বালানির দাম দ্বিতীয় দফায় বাড়ানোর প্রয়োজন ছিল না। কারণ, ইতিমধ্যে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম কমতে শুরু করেছে। এটি সমন্বয় করা যেত। সাধারণ মানুষ, তথা যারা কম পরিমাণে বিদ্যুত্ ব্যবহার করেন, তাদের ক্ষেত্রে দাম না বাড়িয়ে, যারা বেশি পরিমাণে বিদ্যুত্ ব্যবহার করেন, তাদের ক্ষেত্রে দাম বাড়ানো যেতে পারে। 


হাওরের বন্যায় কৃষকের ক্ষতি ১২শ থেকে ১৮শ কোটি টাকা:


সম্প্রতি হাওর অঞ্চলে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের নিয়ে একটি পর্যালোচনা করেছে সিপিডি। এতে দেখা যায়, হাওরে বন্যায় যে ক্ষতি হয়েছে তার আর্থিক মূল্য ১২শ কোটি টাকা থেকে ১৮শ কোটি টাকা হতে পারে। কৃষি বিভাগ বলছে এপ্রিলের ঐ সময়ে ২ লাখ ১৪ হাজার মেট্রিক টন চাল উত্পাদনের ক্ষতি হয়েছে। সিপিডির হিসাবে সবমিলিয়ে ধান উত্পাদনে ক্ষতি হয়েছে ৫ লাখ ২২ হাজার মেট্রিক টন যা ৩ লাখ ৩৯ হাজার ৪৪৯ মেট্রিক টন চাল উত্পাদনের সমান।


ব্যাংকিং খাতে খেলাপিঋণ কমেনি বরং প্রকৃত সমস্যা আড়াল হয়েছে


দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপিঋণের (এনপিএল) হার কিছুটা কমলেও প্রকৃত উন্নতি নয়, বরং ঋণ পুনঃতপশিল, পুনর্গঠন ও রাইট-অফের মতো পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রকৃত সংকট আড়াল করা হয়েছে বলে মনে করে সিপিডি। সিপিডি বলছে, ঋণ-ক্ষতি সংরক্ষণ (লোন লস প্রভিশনিং) ঘাটতির কিছু উন্নতি দেখা গেলেও তা সম্পদের গুণমান উন্নত হওয়ার ইঙ্গিত দেয় না। বরং রাইট-অফ ও পুনর্গঠনের কারণে সূচকগুলো কিছুটা ভালো দেখাচ্ছে। ব্যাংক খাতে অন্তর্নিহিত ঋণঝুঁকি এবং খেলাপি ঋণসংক্রান্ত দুর্বলতা এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। ফাহমিদা খাতুন বলেন, ১৭টি ব্যাংকের সম্পদমান পর্যালোচনা (অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ) শুরু হয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি ব্যাংকের পর্যালোচনায় প্রকাশিত হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি খেলাপিঋণের তথ্য পাওয়া গেছে।


যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বাণিজ্যচুক্তি (শুল্কসংক্রান্ত চুক্তি) পর্যালোচনা করা দরকার মন্তব্য করে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র পালটা শুল্ক বসিয়েছিল ৬০টি দেশের ওপর। মাত্র ৯টি দেশ তাদের সঙ্গে চুক্তি করেছে। মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের গড় শুল্ক ১৫ শতাংশ। তার ওপর অতিরিক্ত ১৯ শতাংশসহ মোট ৩৪ শতাংশ শুল্ক বসবে। এ নিয়ে আমরা চুক্তি করেছি। অন্যদিকে যারা চুক্তি করেনি, তাদের কিন্তু ১৯ শতাংশ নেই। তাহলে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কোথায় দাঁড়াবে, সেটি বিবেচনায় নিতে হবে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মার্কিন শুল্ক চুক্তিটি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন পে-স্কেল বা বেতন কাঠামো নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ২০১৫ সালের পর দীর্ঘ ১১ বছর পর নতুন একটি পে-স্কেল কার্যকর হতে যাচ্ছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় এ সংক্রান্ত একটি কমিশন করা হয়েছিল। এটি বাস্তবায়নে সরকারের বড় অঙ্কের তহবিল লাগবে, যা হয়তো একবারে সম্ভব নয়। আসন্ন বাজেটে একটি পথরেখা দিয়ে ধাপে ধাপে এটি বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।



শেয়ার করুন