১৫ জুলাই ২০২৬, বুধবার, ০৮:২৯:২৯ অপরাহ্ন
রূপকথা ফেরাতে গাঢ় নীল জার্সিতে নামছে আর্জেন্টিনা
  • আপডেট করা হয়েছে : ১৫-০৭-২০২৬
রূপকথা ফেরাতে গাঢ় নীল জার্সিতে নামছে আর্জেন্টিনা

ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এবং পরাশক্তি ইংল্যান্ডের মধ্যকার সেমিফাইনালে দল দুটির জার্সির রং নিয়ে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়েছে। ইংল্যান্ড এই ম্যাচে অফিশিয়ালি স্বাগতিক বা ‘হোম' দল হিসেবে খেলবে। টমাস টুখেলের দল তাদের ঐতিহ্যবাহী অল-হোয়াইট বা সম্পূর্ণ সাদা রঙের হোম জার্সি পরে মাঠে নামবে। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা তাদের চেনা আকাশি-নীল ও সাদা স্ট্রাইপের হোম জার্সি বাদ দিয়ে ঐতিহাসিক নেভি ব্লু বা গাঢ় নীল রঙের অ্যাওয়ে কিট পরে খেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বা ফিফা এই জার্সি পরিবর্তনের বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি না দিলেও প্রখ্যাত আর্জেন্টাইন সাংবাদিক গ্যাস্টন এদুর মতে, আর্জেন্টিনা দল নিজেই ফিফার কাছে এই বিশেষ অনুরোধ জানিয়েছে।


আর্জেন্টিনার এই জার্সির পরিবর্তনের নেপথ্যে ফুটবলীয় অন্ধবিশ্বাস বা যাকে তারা নিজস্ব সংস্কৃতিতে 'কাবালা' বলে, তা জড়িয়ে আছে। আর্জেন্টাইন ফুটবল সংস্কৃতিতে এই ধরনের কুসংস্কার অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে । এই নীল জার্সি ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে অতীতে পাওয়া দুটি সবচেয়ে বিখ্যাত বিশ্বকাপ জয়ের অমর স্মৃতি বহন করছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আইকনিক ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে। সেদিন কিংবদন্তি ডিয়েগো ম্যারাডোনা এই গাঢ় নীল রঙের টপ এবং কালো শর্টস পরে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে এক অবিস্মরণীয় জাদুকরী পারফরম্যান্স দেখিয়েছিলেন। তিনি ২-১ ব্যবধানের সেই ম্যাচে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত দুটি গোল করেন, যার একটি 'হ্যান্ড অব গড' এবং অন্যটি ‘শতাব্দীর সেরা গোল' হিসেবে বিশ্ব জুড়ে সমাদৃত ।


এর ঠিক বারো বছর পর ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে আবারও এই নীল জার্সি পরে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হয়েছিল আলবিসেলেস্তেরা। সেই থ্রিলারে ম্যাচটি ২-২ গোলে ড্র হওয়ার পর এক নাটকীয় পেনাল্টি শুটআউটে জয় পায় আর্জেন্টিনা। সেই ম্যাচে আর্জেন্টাইন তারকা ডিয়েগো সিমিওনেকে লাথি মারার অপরাধে ইংলিশ তারকা ডেভিড বেকহাম লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন। কাকতালীয়ভাবে, ডিয়েগো সিমিওনের ছেলে জিউলিয়ানো সিমিওনে বর্তমান ২০২৬ সালের আর্জেন্টিনা স্কোয়াডে রয়েছেন, যা এই দ্বৈরথের আবেগকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।


জার্সি পরিবর্তনের পেছনে কেবল কুসংস্কার বা ইতিহাস নয়, বরং ফিফার পোশাকসংক্রান্ত বাস্তব নিয়মকানুনও বড় কারণ। ফিফা সাধারণত সব সময়ই চায় যেন দলগুলো তাদের প্রথম পছন্দের হোম জার্সি পরে মাঠে নামে। তবে যখন দুটি প্রতিদ্বন্দী দলের জার্সির রঙে পর্যাপ্ত বৈপরীত্য থাকে না, তখন ফিফা যে কোনো একটি দলকে তাদের বিকল্প জার্সি পরার নির্দেশ দেয়। এই নিয়মটির পেছনে আরেকটি মানবিক কারণও রয়েছে, তা হলো বর্ণান্ধ বা রং দেখার ক্ষেত্রে সমস্যা থাকা দর্শকদের টিভি পর্দায় খেলা দেখার সুবিধা নিশ্চিত করা। তারা যাতে দুটি দলের মধ্যে সহজেই পার্থক্য করতে পারেন, সেজন্য হালকা বনাম গাঢ় রঙের জার্সির সংমিশ্রণ নিশ্চিত করা হয়। চলতি ২০২৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা মাত্র এক বার এই নীল অ্যাওয়ে কিট পরে মাঠে নেমেছিল, যা ছিল গ্রুপ পর্বে জর্ডানের বিপক্ষে ৩-১ ব্যবধানে জয়ের ম্যাচে। টুর্নামেন্টের বাকি সব ম্যাচে মেসির দল চিরাচরিত হোম জার্সিই ব্যবহার করেছে। অন্যদিকে ইংল্যান্ড দলও পানামার বিপক্ষে শেষ গ্রুপ ম্যাচটি বাদে টুর্নামেন্টের অন্য সব ম্যাচেই সাদা হোম জার্সি পরে খেলেছে।


তবে আর্জেন্টিনার এই নীল জার্সির সব স্মৃতিই কিন্তু সুখকর নয়। তারা ১৯৯০ এবং ২০১৪ সালের ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনালে এই গাঢ় নীল রঙের জার্সি পরে মাঠে নেমেছিল এবং দুই বারই জার্মানির কাছে ১-০ ব্যবধানে হেরে ট্রফি হাতছাড়া করে। বিপরীতে ২০২২ সালে কাতারের মাটিতে লিওনেল মেসি যখন ঐতিহাসিক বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরেন, তখন তার গায়ে ছিল আর্জেন্টিনার সেই ক্লাসিক আকাশি-নীল ও সাদা স্ট্রাইপের হোম জার্সি। এছাড়া ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে নীল জার্সির বাইরে অন্য জার্সির রেকর্ডও বেশ বৈচিত্র্যময়। ২০০২ সালের জাপান বিশ্বকাপে এই দুই দলের হোম এবং অ্যাওয়ে জার্সি বিপরীত করা হয়েছিল। সেদিন ইংল্যান্ড লাল জার্সি পরে খেলেছিল এবং আর্জেন্টিনা তাদের ঐতিহ্যবাহী স্ট্রাইপ জার্সি পরে মাঠে নেমেছিল, যেখানে ডেভিড বেকহ্যামের একমাত্র পেনাল্টি গোলে ১-০ ব্যবধানে জিতে মধুর প্রতিশোধ নিয়েছিল ইংলিশরা। 


এরপর আন্তর্জাতিক ফুটবলে তাদের সর্বশেষ আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০০৫ সালে সুইজারল্যান্ডে। সেই ম্যাচে মাইকেল ওয়েনের দুর্দান্ত জোড়া গোলের ওপর ভর করে ইংল্যান্ড ৩-২ ব্যবধানে জয়লাভ করে এবং সেদিনও আর্জেন্টিনা তাদের নীল অ্যাওয়ে জার্সি পরেই মাঠে নেমেছিল। ২০০৫ সালের সেই হাইভোল্টেজ ম্যাচে লিওনেল মেসি খেলেননি। তার ঠিক তিন মাস আগে হাঙ্গেরির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ফুটবলে মেসির অভিষেক হয়েছিল, কিন্তু প্রথম ম্যাচেই লাল কার্ড পাওয়ার কারণে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটিতে তিনি নিষিদ্ধ ছিলেন। ফলে আজ আটলান্টার ম্যাচটিই হতে যাচ্ছে বিশ্বফুটবলের ইতিহাসে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ফুটবল জাদুকর লিওনেল মেসির ক্যারিয়ারের প্রথম অফিশিয়াল ম্যাচ।


শেয়ার করুন