আ.লীগের পদ যেন ভালুকার মোস্তফা পরিবারে আলাদিনের চেরাগ


, আপডেট করা হয়েছে : 17-12-2022

আ.লীগের পদ যেন ভালুকার মোস্তফা পরিবারে আলাদিনের চেরাগ

এ যেন রূপকথার গল্প! কি এমন আলাদিনের চেরাগ হাতে পেলেন মোস্তফা পরিবার? যে কারণে একসঙ্গে অল্প সময়ের ব্যবধানে বিপুল পরিমাণ অর্থবিত্তের মালিক হয়ে গেলেন।

বলা হচ্ছে, সংখ্যালঘু, হতদরিদ্র ও মুক্তিযোদ্ধার জমি দখলে আলোচিত সেই ভালুকা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা পরিবার ও তার স্বজনের কথা।

ভালুকার রাজনীতিবিদ থেকে সাধারণ মানুষের মুখে মুখে এখন মোস্তফা পরিবারের জিরো থেকে হিরো এবং অল্প সময়ে কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়ে ওঠা মোস্তফার ভাগিনা মনির ও আকরামের নাম। এর মধ্যে রয়েছে তার শ্যালিকা পুতুলের জামাই, আপন ছোট ভাই শামশু ও শ্যালিকা লাকীর জামাই তসলিম খানের গল্প। গোলাম মোস্তফার ক্ষমতার দাপটে এদের উত্থানে ঠিক যেন রূপকথার গল্পকেও হার মানায়।

প্রতিযোগিতা করে ক্ষমতার দাপটে আওয়ামী লীগের নাম ভাঙিয়ে সংখ্যালঘু, অর্ধশতাধিক হতদরিদ্র সাধারণ মানুষ ও ভালুকা উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ভাষাসৈনিক ডাক্তার আবদুল লতিফের জমি দখলের কারণে বরাবরই আলোচনায় থাকে পরিবারটি। যদিও শত অভিযোগ, আন্দোলন, মানববন্ধন করেও এখন পর্যন্ত কারও দখলকৃত জমি উদ্ধার করতে পারেনি ভুক্তভোগী পরিবার।

অভিযোগ আছে, দলীয় পদবি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে জোরপূর্বক ভালুকার বিভিন্ন এলাকায় অসহায় মানুষের জমি জবরদখল করে গড়ে তুলেছেন দুই ডজন দুই তলা থেকে ৭তলা বিল্ডিং ও অর্ধশতাধিক সেমিপাকা বাড়ি, যেখানে রয়েছে ৫শ’র মতো টিনশেড রুম।

স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের দাবি, রাজাকার জামাতা ভালুকা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সাম্পাদক পদ পাওয়ার পর যেন তার জীবনের গতিপথ পালটে সোনার হরিণের ছোঁয়া পেয়েছেন।

জন্ম ভরাডোবা ইউনিয়নের পুরুড়া গ্রামের পৈতৃক ভিটায় তালপাতার ছাউনিতে হলেও গোলাম মোস্তফা বর্তমানে বসবাস করছেন ১০ কোটি টাকা দামের ডুপ্লেক্স বাড়িতে। এ আওয়ামী লীগের পদ যেন তার পরিবারে আলাদিনের চেরাগ।

অনুসন্ধানে জানা যায়, মোস্তফা পরিবার ও তার স্বজনদের জমি দখলের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে ভালুকায় ‘ওপেন সিক্রেট’। দখল ভীতির কারণে জেলার বাইরে থেকে কোনো ব্যক্তি বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ওই এলাকায় জমি কিনতে আসে না। এছাড়া এলাকার সংখ্যালঘু ও অসহায় গরিবের জমি জোরপূর্বক দখল করার অভিযোগও রয়েছে তার পরিবারের বিরুদ্ধে।

স্থানীয় সূত্রমতে, ২০০৮ এ আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ক্ষমতার দাপট ও নিজের একক আধিপত্য বলয় তৈরি করে গড়ে তুলেছেন একাধিক বাহিনী।

অভিযোগ আছে, গোলাম মোস্তফা ও স্বজনরা জোরপূর্বক অন্যের জমি দখল, চাকরির পদ বাণিজ্য, মামলা-হামলার ভীতি প্রদর্শন করে তাদের নামে ও বেনামে গড়েছেন সম্পদের পাহাড়। তাদের হাত থেকে আওয়ামী লীগের প্রবীণ ও বর্ষীয়ান নেতাকর্মী থেকে শুরু করে সংখ্যালঘু ও অসহায় পরিবার এমনকি রাস্তার ভিক্ষুক পর্যন্ত রেহাই পায়নি।

জমি দখল করা প্রসঙ্গে কাচিনা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মৃত আব্দুল লতিফের ছেলে সাবেক সেনাবাহিনীর সদস্য মো. আব্দুল আজিজ যুগান্তরকে জানান, ১৯৯৬ সালে পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডে কলেজের পশ্চিম পাশের ভান্ডবর মৌজায় সিএস ১২৭১ নাম্বার দাগে ৮ শতাংশ জমি জোরপূর্বক দখল করে নেয় মোস্তফা ও তার ভাগনেরা। পরে ভয়ভীতি দেখালে সিএস ১২৭২ নাম্বার দাগে আরও ৪ শতাংশ জমি তাদের দিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছি। কোনো প্রকার টাকা-পয়সা ছাড়াই সর্বমোট ১২ শতাংশ জমি জোরপূর্বক দখল করে সেখানে টিনশেড বাড়ি নির্মাণ করেছে গোলাম মোস্তফা গংরা।

তিনি আরও বলেন, আমাদের বেদখল হওয়া ১২ শতাংশ জমি ফিরে পেতে কোর্টে মামলা করেও লাভ হয়নি। তাদের ক্ষমতার দাপট ও হুমকি-ধমকি এবং মৃত্যুর ভয়ে আপস মীমাংসায় যেতে বাধ্য হয়েছি আমরা। আপস মীমাংসা হলেও আজ পর্যন্ত ওই জমি বাবদ টাকা-পয়সা দেননি মোস্তফা, এমনকি ওই জমির রেজিস্ট্রি পর্যন্ত করে নেয়নি তারা। ক্ষমতার দাপটে দখল করে আছে তার পৈতৃক ও ক্রয়কৃত জমি। এ যেন এক মগের মুল্লুক শাসন চলছে ভালুকায়।

স্থানীয়দের তথ্যমতে, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফার ভাগিনা কায়সার আহমেদ মনির ওরফে মনিরুল ইসলাম মনিরের একটি ফটোকপির দোকান ছিল। সেই ফটোকপি দোকানের মালিক মনির এখন শত কোটি টাকার মালিক। আবার কারও কারও ধারণা, মনিরের সম্পত্তির পরিমাণ কয়েকশ কোটি টাকার বেশি। গোলাম মোস্তফার আরেক ভাগিনা উপজেলার ৭নং মল্লিকবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এসএম আকরাম হোসাইনের অবস্থাও ঠিক মনিরের মতো। মামার ক্ষমতার দাপটে তিনিও হয়েছেন শত কোটি টাকার মালিক।

এছাড়া ২০১৪ থেকে ১৫ ও ১৬ সাল পর্যন্ত উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মোর্শেদের ম্যানেজার হিসাবে দায়িত্ব পালন করা মোস্তফার ভায়রা সেই তসলিম খানও এখন শত কোটি টাকার মালিক। এখানেই শেষ নয়, এলাকায় হোন্ডা চুরি সিন্ডিকেটের অন্যতম গডফাদার হিসাবে পরিচিত মোস্তফার ছোট ভাই শামশু। হোন্ডা চুরির অভিযোগে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছিলেন তিনি। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভাইয়ের দাপট কাজে লাগিয়ে তিনিও নিজের নামে সম্পদ গড়তে পিছিয়ে থাকেননি। রাতারাতি হয়েছেন বহু সম্পদের মালিক।

জানা যায়, গোলাম মোস্তফার ভাগনে কায়সার আহমেদ মনির ওরফে মনিরুল ইসলাম মামার ক্ষমাতার দাপট দেখিয়ে হঠাৎ করে বিত্ত-বৈভবের মালিক হয়েছেন। ভালুকা পৌরসভার বটটিনা বাজারের দক্ষিণে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পূর্ব পাশে ৫ শতাংশ জমিতে টিনশেড বাসা, ভালুকা ডিগ্রি কলেজের পূর্বে কলেজপাড়ায় ৭ শতাংশ জমিতে ৫তলা ফাউন্ডেশনের ৩তলা ভবন এবং মল্লিকবাড়ী ইউনিয়নের বিরামনগর এলাকায় মল্লিকবাড়ী ইউনিয়নের মামারিশপুর গ্রামের আতিয়া মিলের সামনে ৭ শতাংশ জমিতে ৫তলা বিশিষ্ট ভবনের ৩তলা নির্মাণ কাজ শেষ করেছেন তিনি। এছাড়া কলেজ গেটের পশ্চিমে সিদ্দিকের বাসার সামনে ৭তলা বিশিষ্ট বাড়ি, পৌরসভার ভান্ডার মৌজায় ৩ শতাংশ জমির ওপর পাঁচতলা ভবন রয়েছে তার। ভালুকা পৌরসভার ভালুকা ব্রিজের দক্ষিণে কাঁঠালী মৌজায় ডা. গিয়াস উদ্দিনের বাসার দক্ষিণে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে ২১ শতাংশ জমিতে টিনশেড ঘরসহ বাড়ি, মল্লিকবাড়ী ইউনিয়নের মল্লিকবাড়ী বাজারে ৬ শতাংশ জমিতে টিনশেড বাড়ি, ভরাডোবা ইউনিয়নের নিশিন্দা মৌজায় ৭ শতাংশের মধ্যে টিনশেড বাড়ি রয়েছে মনিরের। হবিরবাড়ী ইউনিয়নের হবিরবাড়ী মৌজায় সিএস ৮২৯ দাগে ১ একর জমির মধ্যে বাউন্ডারি করে নার্সারি, পৌরসভার ভান্ডার মৌজায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পশ্চিম পাশে ৫৪ শতাংশ জমিতে রিজভী নার্সারি রয়েছে। অন্যদিকে জোরপূর্বক জমি দখল করে ভান্ডার মৌজায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে ৫ শতাংশ জমিতে টিনশেড দোকানঘর এবং রড-সিমেন্টের ব্যবসা করার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। মল্লিকবাড়ী ইউনিয়নের ভান্ডার মৌজায় প্রায় ২০ শতাংশ জমির ওপর আকরাম চেয়ারম্যানের বাড়ি রয়েছে। শুধু ভালুকা উপজেলায় আওয়ামী লীগের নাম ভাঙিয়ে মনিরুল ইসলাম মনির অর্ধশতাধিক মানুষের জমি ক্রয় করার কথা বলে নামমাত্র বায়না করে জবরদখল করে নিয়েছেন। খেটে খাওয়া সামান্য ফটোকপি দোকানদার মনিরের রয়েছে কমপক্ষে অর্ধশত কোটি টাকার সম্পদ।

এতে পিছিয়ে নেই সাবেক উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সাম্পাদক গোলাম মোস্তফা ও তার স্ত্রী, সন্তান। এছাড়াও তার রয়েছে নামে-বেনামে ডজনখানেক বাড়িঘর।

মনির, আকরাম ও তসলিম এরা সবাই সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যানের পরস্পর আত্মীয় হওয়ার কারণে পুলিশ-প্রশাসনকে নিজেদের পক্ষে নিয়ে সংখ্যালঘু ও সমাজের নিরীহ মানুষদের ঠকিয়ে নামে-বেনামে বহু সম্পত্তির মালিক বনে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। এলাকার সাধারণ মানুষের মনে ঘুরেফিরে একটিই প্রশ্ন দানা বেঁধে রয়েছে, গোলাম মোস্তফার ভায়রা ও ভাগিনারা কি এমন ব্যবসা করেন যে তারা প্রত্যেকেই রাতারাতি শত কোটি টাকার মালিক হয়ে গেলেন।

যুগান্তরকে স্থানীয় ষাটোর্র্ধ্ব এক ভুক্তভোগী প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে, দলীয় নেতারা ক্ষমতায় থাকলে কি দিনকে রাত, আর রাতকে দিন বানাতে পারে? রাতারাতি কোটিপতি হতে পারে? যদি তাই না হয়, আ.লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর কীভাবে নিজের নাম পরিবর্তন করে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যানের ভাগনে মনির কায়সার আহমেদ মনির থেকে মনিরুল ইসলাম মনির হয়ে গেল? কীভাবে প্রায় শত কোটি টাকার মালিক হয়ে গেল?

স্থানীয়রা বলছেন, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মোস্তফার শ্যালিকা লাকীর জামাই তসলিম খান, ভাগনে আকরাম ও মনির প্রত্যেকেই এখন শত কোটি টাকার মালিক। তবে তাদের আয়ের উৎস জানা নেই কারও। তাই মানুষের মুখে মুখে রটে গেছে এক মোস্তফার আ.লীগের পদবি যেন সবার আলাদিনের চেরাগ। যে কারণে তারা নিজেদের নামে সম্পদের পাহাড় গড়ে রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে গেছেন। মোস্তফা ও তার স্বজনদের বিরুদ্ধে অর্ধশতাধিক সংখ্যালঘু ও স্থানীয়দের জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগীরা বিভিন্ন সময় মানববন্ধন ও আন্দোলন করেছেন।

এ ব্যাপারে অভিযুক্ত গোলাম মোস্তফার সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে প্রতিবেদকের পরিচয় পাওয়ার পর সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। গোলাম মোস্তফার ভাগিনা কায়সারুল হক মনির ওরফে মনিরুল ইসলাম মনিরের সঙ্গে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে এসএমএস এর মাধ্যমে যোগাযোগ করা হলেও কোনো সাড়া মেলেনি।


  • সম্পাদক ও প্রকাশক: ইঞ্জিনিয়ার মো: রায়হানুল ইসলাম

  • উপদেষ্টাঃ মোঃ ইব্রাহীম হায়দার