জীবনের শেষ বয়সে এসে নিজের শেষ সম্বলটুকু হারানোর অভিযোগ নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে হাজির হয়েছিলেন এক মা। তাঁর অভিযোগ, অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে বড় ছেলে জোর করে টিপসই নিয়ে তাঁর নামে থাকা তিন কাঠা জমি রেজিস্ট্রি করে নিয়েছেন। জমি ফেরত চাইতে গিয়ে এখন মেয়ে ও পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলা, মিথ্যা মামলা ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এমন অভিযোগ তুলে ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তা দাবি করেছেন রাজশাহীর পুঠিয়ার বানেশ্বর খুটিপাড়া এলাকার বৃদ্ধা শহর বানু। মঙ্গলবার (৭ জুলাই) বিকেলে রাজশাহী সাংবাদিক ইউনিয়নে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শহর বানু এসব অভিযোগ করেন। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন শহর বানুর পক্ষে সুফিয়া বেগমের পুত্রবধূ মুক্তি খাতুন।
এবিষয়ে শহর বানু বলেন, তাঁর বড় ছেলে আলম অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে জোর করে তাঁর কাছ থেকে টিপসই নেন। পরে তাঁর শেষ সম্বল তিন কাঠা জমি রেজিস্ট্রি করে নেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। শহর বানু বলেন, ‘আমার শেষ সম্বল ছিল ওই জমি। আমি জমিটি ফেরত চাই।’
সংবাদ সম্মেলনে শহর বানুর মেয়ে সুফিয়া বেগম বলেন, তাঁর মা আগেই সন্তানদের মধ্যে সম্পত্তি ভাগ করে দিয়েছেন। মায়ের নামে থাকা তিন কাঠা জমিই ছিল তাঁর শেষ ভরসা। কিন্তু অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে কৌশলে জমিটি রেজিস্ট্রি করে নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনার প্রতিবাদ করায় তাঁকে হামলা, মিথ্যা মামলা ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সুফিয়া বেগম বলেন, ‘আমি মায়ের জমি ফেরত চাই। একই সঙ্গে আমার ওপর হামলা ও হুমকির ঘটনায় সুষ্ঠু বিচার চাই।’
লিখিত বক্তব্যে মুক্তি খাতুন বলেন, তাঁদের পরিবার দীর্ঘদিন ধরে জমি-সংক্রান্ত বিরোধের জেরে হামলা, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও মিথ্যা অপপ্রচারের শিকার হচ্ছে। একই এলাকার সুজন, নুসরাত জাহান বিউটি ও আলমদের সঙ্গে তাঁদের জমি নিয়ে বিরোধ চলছে। গত ১০ জুন তাঁদের বাড়িতে প্লাস্টারের কাজ চলছিল। এ সময় মিস্ত্রি জমির পাশের কাঁটা সরাতে গেলে প্রতিপক্ষ বাধা দেয় এবং অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু করে।
মুক্তি খাতুনের অভিযোগ, প্রতিবাদ করলে প্রতিপক্ষ তাঁদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। হামলায় তাঁর শাশুড়ি সুফিয়া বেগমের মাথায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়। এতে তিনি গুরুতর আহত হন এবং তাঁর মাথায় একাধিক সেলাই দিতে হয়। এ ছাড়া মুক্তি খাতুনসহ পরিবারের অন্য সদস্যদেরও মারধর করা হয়।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, হামলার সময় সুফিয়া বেগমের গলায় থাকা প্রায় আট আনি ওজনের একটি স্বর্ণের চেইন ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এ ছাড়া শ্লীলতাহানির চেষ্টা ও প্রাণনাশের হুমকির ঘটনাও ঘটে।
মুক্তি খাতুন বলেন, ঘটনার পর তাঁরা পুঠিয়া থানায় অভিযোগ করলেও কার্যকর প্রতিকার পাননি। পরে তাঁরা আদালতের শরণাপন্ন হয়ে মামলা করেন। জমি-সংক্রান্ত বিরোধ নিয়ে পুঠিয়া উপজেলা ভূমি অফিসে মিসকেস চলমান রয়েছে বলেও জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে মুক্তি খাতুন বলেন, ‘আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আইন অনুযায়ী যে সিদ্ধান্ত হবে, আমরা তা মেনে নেব। কিন্তু আমাদের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হয়রানিমূলক মামলা দেওয়া হচ্ছে।’
লিখিত বক্তব্যে অভিযোগ করা হয়, অভিযুক্তদের মধ্যে প্রেমতলী ডিগ্রি কলেজের শিক্ষিকা নুসরাত জাহান বিউটিও রয়েছেন। এদিকে গত ২৮ জুন বিভিন্ন গণমাধ্যমে নুসরাত জাহান বিউটি ও তাঁর চতুর্থ স্বামীকে জড়িয়ে তাঁর মেয়ের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে। সেই ঘটনায় মেয়ের অভিযোগের বরাত দিয়ে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, দেনমোহরের অর্থের লোভে অন্যত্র বিয়ে করতে রাজি না হওয়ায় তাঁকে শারীরিক নির্যাতন করা হয়, জোর করে ফাঁকা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়া হয় এবং পেটে লাথি মারার ফলে গর্ভের সন্তান নষ্ট হয়ে যায়। ওই ঘটনায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া এবং একটি মামলা দায়েরের কথাও উল্লেখ করেন সংবাদ সম্মেলনে।
মুক্তি খাতুন বলেন, একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলন থেকে সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে কয়েক দফা দাবি জানানো হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে হামলার ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা, পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং উভয় পক্ষের করা মামলাগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত আলমের ছেলে সুজন বলেন, জমি নিয়ে স্থানীয় চেয়ারম্যানের মাধ্যমে তিনবার ফয়সালা হয়েছে। তাঁর দাবি, সংশ্লিষ্ট জমির কোনো অস্তিত্ব হোল্ডিং রেকর্ডে নেই। তিনি বলেন, ‘সুফিয়া বেগম আমার আপন ফুফু। তাঁরা জোরপূর্বক জায়গাটি দখল করতে চাইছেন।’
সুফিয়া বেগমের মাথায় আঘাত ও মারধরের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে সুজন বলেন, তিনি এসব বিষয়ে কিছু জানেন না। তবে নুসরাত জাহান বিউটির বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলনে তোলা অভিযোগ এবং মায়ের কাছ থেকে টিপসই নিয়ে জমি নেওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বানেশ্বর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক দুলাল বলেন, "এ বিষয়ে আমাকে আগে কেউ জানায়নি। তবে দুই দিন আগে একটি বাসায় দাওয়াত খেতে গেলে ওই বৃদ্ধা মহিলা (সুফিয়া বেগম) আমাকে বিষয়টি জানান।" তিনি আরও বলেন, "ভাত-কাপড়সহ তাঁকে কোনো ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয় না।"
পুঠিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফরিদুল ইসলাম বলেন, থানায় কেউ আইনি সহযোগিতা চাইলে আইন অনুযায়ী সহযোগিতা করা হয়। বিষয়টি ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জমি-সংক্রান্ত বিরোধ হতে পারে। অভিযোগ তদন্ত করে আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।