মার্কিন হামলা ঠেকাতে আঙ্কারায় যাচ্ছেন আরাঘচি, রাজি করিয়েছে তুরস্ক


, আপডেট করা হয়েছে : 31-01-2026

মার্কিন হামলা ঠেকাতে আঙ্কারায় যাচ্ছেন আরাঘচি, রাজি করিয়েছে তুরস্ক

যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক হামলা এড়াতে আলোচনা করতে তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারা সফরে যাচ্ছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। তুর্কি কূটনীতিকেরা মনে করছেন, সংঘাত এড়াতে হলে তেহরানকে পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে কিছু ছাড় দিতে হবে।


শুক্রবার আঙ্কারায় আরাঘচির সফরটি হচ্ছে এমন এক সময়ে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হুমকিতে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। একই প্রেক্ষাপটে ইরান ইস্যুতে আলোচনার জন্য ইসরায়েল ও সৌদি আরবের জ্যেষ্ঠ প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারাও চলতি সপ্তাহে ওয়াশিংটনে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে।


তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের মধ্যে একটি ভিডিও কনফারেন্সের প্রস্তাব দিয়েছেন। কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, এমন উচ্চপর্যায়ের সরাসরি যোগাযোগ ট্রাম্পের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে। তবে সতর্ক ইরানি কূটনীতিকদের কাছে বিষয়টি অনাকাঙ্ক্ষিত বলে বিবেচিত হচ্ছে। উল্লেখ্য, গত এক দশকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কোনো সরাসরি আলোচনা হয়নি।


গত বৃহস্পতিবার মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, ‘চুক্তি করার সব পথ ইরানের সামনে খোলা আছে। তাদের পরমাণু সক্ষমতার পথে এগোনো উচিত নয়। প্রেসিডেন্ট যা প্রত্যাশা করবেন, আমরা তা করতে প্রস্তুত।’


এর আগে ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, ইরানের জন্য সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে এবং যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে তা হবে ভয়ংকর ও ব্যাপক। তবে বৃহস্পতিবার রাতে ওয়াশিংটনের কেনেডি সেন্টারে দেওয়া বক্তব্যে তিনি কিছুটা নমনীয় সুরে জানান, ইরানের সঙ্গে কথা বলার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। ট্রাম্প বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমাদের অনেক বড় ও শক্তিশালী জাহাজ ইরানের দিকে এগোচ্ছে। যদি সেগুলো ব্যবহার না করতে হয়, সেটাই সবচেয়ে ভালো হবে।’


অন্যদিকে ইরান এখনো কঠোর অবস্থানেই রয়েছে। দেশটির সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল আমির হাতামি জানিয়েছেন, গত জুনে ১২ দিনের যুদ্ধের পর ইরান তার রণকৌশলে পরিবর্তন এনেছে এবং এক হাজার জল ও স্থলভিত্তিক ড্রোন তৈরি করেছে। তাঁর ভাষায়, এসব ড্রোন এবং ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার যেকোনো হামলার ‘দাঁতভাঙা’ জবাব দিতে সক্ষম।


মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, প্রায় ৩০ হাজার মার্কিন সেনা ইরানের স্বল্প পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ‘ওয়ান–ওয়ে’ ড্রোনের নাগালের মধ্যে রয়েছেন। একই সঙ্গে এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তেহরান সামরিক প্রস্তুতির পাশাপাশি কূটনৈতিক পথও খোলা রাখছে।


এই পরিস্থিতিতে ক্রেমলিন উভয় পক্ষকে কূটনীতির সুযোগ কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়েছে। কূটনৈতিক মহলে ধারণা করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতার ক্ষেত্রে তুরস্কই এখন প্রধান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো আশঙ্কা করছে, সংঘাত শুরু হলে তা পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে।


ইরানের অভ্যন্তরে সরকারকে ছাড় দেওয়ার পক্ষে থাকা কণ্ঠগুলো ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। সমাজটি এখন গভীরভাবে বিভক্ত। এক পক্ষ যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের পক্ষে, অন্য পক্ষ বর্তমান শাসনব্যবস্থার পতন চায়। সাম্প্রতিক বিক্ষোভে নিহতদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশের প্রতিশ্রুতি দিয়ে জনক্ষোভ প্রশমনের চেষ্টা করেছেন প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান। তবে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রভাব ও ব্যাপক অবিশ্বাসের কারণে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে।


এভিন কারাগারে বন্দী রাজনীতিক মোস্তফা তাজজাদেহ সরকার ঘোষিত নিহতের সংখ্যাকে ‘লজ্জাজনক মিথ্যা’ বলে আখ্যায়িত করে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন।


মার্কিন প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ওয়াশিংটনের সুনির্দিষ্ট দাবিগুলো ইরান পুরোপুরি বুঝতে পেরেছে। এসব দাবির মধ্যে রয়েছে—উন্নত মানের ইউরেনিয়াম মজুত তৃতীয় পক্ষের কাছে হস্তান্তর, দেশে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধতা এবং প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই শর্তগুলো ইরানের জন্য মেনে নেওয়া কঠিন হবে।


কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেন, ‘ইরানে হামলা চালানো ভুল হবে। নতুন করে যুদ্ধ শুরু করাও ভুল সিদ্ধান্ত। ইরান পরমাণু ইস্যুতে আলোচনায় বসতে প্রস্তুত।’ তিনি স্বীকার করেন, আলোচনার টেবিলে ইরান বড় চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে এবং বিষয়টি তাদের জন্য রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল।


এদিকে সম্ভাব্য ইরানি পাল্টা হামলা এড়াতে উপসাগরীয় অঞ্চলের অধিকাংশ দেশ জানিয়েছে, তারা ইরানের বিরুদ্ধে কোনো হামলার জন্য নিজেদের আকাশসীমা বা ভূখণ্ড ব্যবহারের অনুমতি দেবে না।



  • সম্পাদক ও প্রকাশক: ইঞ্জিনিয়ার মো: রায়হানুল ইসলাম

  • উপদেষ্টাঃ মোঃ ইব্রাহীম হায়দার