জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর যৌক্তিকতা


, আপডেট করা হয়েছে : 24-09-2026

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর যৌক্তিকতা

জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেই প্রশ্ন ওঠে- সরকার দাম না বাড়িয়ে আর কত দিন পারত? ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানোর পর এই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে। এর উত্তর খুঁজতে হলে শুধু নতুন দাম কত হয়েছে, তা দেখলে হবে না; দেখতে হবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম, আমদানি ব্যয়, বিপিসির লোকসান এবং জ্বালানি আমদানি অব্যাহত রাখার আর্থিক সক্ষমতা।


বাংলাদেশ তার জ্বালানি চাহিদার বড় একটি অংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করে। অপরিশোধিত তেলের ক্ষেত্রে আমদানি মূলত সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতনির্ভর। পরিশোধিত ডিজেলসহ বিভিন্ন জ্বালানি আসে চীন, মালয়েশিয়া, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর, ওমানসহ বিভিন্ন উৎস থেকে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে দেশের আমদানি ব্যয়ও বাড়ে।


চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত সেই চাপ আরও বাড়িয়েছে। শুধু জ্বালানির দাম নয়, তেল পরিবহনের জাহাজভাড়া, বিমা ও নিরাপদ নৌপথ ব্যবহারের ব্যয়ও বেড়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশকে একদিকে বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হয়েছে, অন্যদিকে তা দেশে আনতেও বেশি খরচ হয়েছে।


এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) হিসাবে। মার্চ থেকে আগস্ট-ছয় মাসে আমদানি করা জ্বালানির মূল্য পরিশোধ করতে গিয়ে সংস্থাটির প্রায় ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে।


তবে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেও সরকার প্রতি মাসে দেশের বাজারে তা সমন্বয় করেনি। এপ্রিল মাসে ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা করা হলেও জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে তা অপরিবর্তিত রাখা হয়। পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দামও কয়েক মাস বাড়ানো হয়নি। ফলে বাড়তি ব্যয়ের একটি বড় অংশ বিপিসিকেই বহন করতে হয়েছে।


এভাবে আর কত দিন চলা সম্ভব ছিল, তার একটি ধারণা পাওয়া যায় বিপিসির আর্থিক পরিস্থিতি থেকে। ১৮ সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের শুরুতে সংস্থাটির হাতে ব্যবহারযোগ্য কার্যকরী মূলধন ছিল প্রায় ১২ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা। অথচ বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদরে জ্বালানি আমদানি অব্যাহত রাখতে আরও ১৫ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। নতুন অর্থায়ন না পেলে অক্টোবর নাগাদ জ্বালানি আমদানির ঋণপত্র বা এলসি খোলায় অর্থসংকট দেখা দিতে পারে বলেও আশঙ্কা ছিল।


এখানে মূল বিষয়টি শুধু লোকসান নয়, জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত রাখার সক্ষমতা। একটি রাষ্ট্র চাইলে ভর্তুকি দিয়ে জ্বালানির দাম কম রাখতে পারে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে ১০০ টাকায় কেনা পণ্য দেশে ৬০ বা ৭০ টাকায় বিক্রি করলে ব্যবধানটি কাউকে না কাউকে বহন করতে হয়- বিপিসি, সরকারি ভর্তুকি, ঋণ কিংবা বাজেটের অর্থ দিয়ে। সেই চাপ অনির্দিষ্টকাল বহন করা সম্ভব নয়।


এ বছরের মার্চের শুরুতেই সরকার জানিয়েছিল, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত জ্বালানি ও এলএনজি খাতে প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত ভর্তুকির প্রয়োজন হতে পারে। তখন ডিজেল ১০০ টাকা লিটারে বিক্রি হলেও মার্চের প্রথম ২৯ দিনে এর প্রকৃত ব্যয় প্রায় ১৯৮ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল বলে সংসদে জানানো হয়। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারের পুরো ব্যয় তখনও ভোক্তার ওপর চাপানো হয়নি।


জ্বালানি আমদানির বাড়তি ব্যয়ের আরেকটি প্রভাব পড়ে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর। একই পরিমাণ জ্বালানি কিনতে বেশি ডলার প্রয়োজন হলে বিপিসির আর্থিক চাপের পাশাপাশি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদাও বাড়ে।


অন্যদিকে, বাংলাদেশ জ্বালানি আমদানি বন্ধ বা বড়ভাবে কমিয়ে দিতে পারে না। ট্রাক, বাস, কৃষির সেচ, শিল্পের যন্ত্রপাতি, পণ্য পরিবহন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের কিছু অংশ জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরশীল। তাই বিপিসির অর্থসংকট এমন পর্যায়ে পৌঁছালে যে নতুন জ্বালানি আমদানির এলসি খোলাই কঠিন হয়ে পড়ে, তখন কম দাম ধরে রাখার চেয়ে সরবরাহ নিশ্চিত করাই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।


এই বাস্তবতায় মূল্য সমন্বয়ের পাশাপাশি সরকার আমদানি অব্যাহত রাখার উদ্যোগও নিয়েছে। সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় ১২ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকার পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সরবরাহকারীদের উচ্চ প্রস্তাবিত দামের কারণে কিছু ক্রয়প্রস্তাব পুনর্বিবেচনা করা হয়েছে। পাশাপাশি চীন ও ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান থেকে জ্বালানি আমদানির পথ বাড়ানো হয়েছে।


জ্বালানির দাম নির্ধারণে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে মূল্য ব্যবধানও একটি বিষয়। বাংলাদেশে দাম দীর্ঘদিন তুলনামূলক কম থাকলে এবং প্রতিবেশী দেশে একই জ্বালানির দাম বেশি হলে সীমান্তপথে পাচারের অর্থনৈতিক প্রণোদনা তৈরি হতে পারে। সর্বশেষ মূল্য সমন্বয়ের ক্ষেত্রে সরকার এটিকেও একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।


তবে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেই দেশের বাজারে একই অনুপাতে দাম বাড়াতে হবে- এমন কোনো নিয়ম নেই। সরকার চাইলে নির্দিষ্ট সময় ভর্তুকি দিয়ে দাম কম রাখতে পারে, এবং চলতি বছর সেটিই করেছে। কিন্তু সেই ভর্তুকিরও আর্থিক সীমা আছে।


সর্বশেষ মূল্যবৃদ্ধির আগে বর্তমান আন্তর্জাতিক দামে প্রতি লিটার ডিজেলে বিপিসির লোকসান প্রায় ৮৯ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। দৈনিক লোকসান দাঁড়িয়েছিল প্রায় ১০৯ কোটি টাকা। এর তুলনায় লিটারপ্রতি ২০ টাকা মূল্য সমন্বয়কে দেখলে বোঝা যায়, আন্তর্জাতিক বাজারের পুরো বাড়তি ব্যয়ও ভোক্তার ওপর দেওয়া হয়নি।


তাই ২১ সেপ্টেম্বরের সিদ্ধান্তকে শুধু ‘জ্বালানির দাম বাড়ানো’ হিসেবে দেখলে পুরো বাস্তবতা ধরা পড়ে না। কয়েক মাস ধরে দাম না বাড়িয়ে বিপিসি বাড়তি ব্যয়ের বড় অংশ বহন করেছে। কিন্তু ছয় মাসে ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা লোকসান, হাতে থাকা কার্যকরী মূলধন এবং আমদানি অব্যাহত রাখতে আরও বিপুল অর্থের প্রয়োজনীয়তা দেখিয়েছে যে আগের মূল্য কাঠামো অনির্দিষ্টকাল ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছিল।


অবশ্য মূল্য সমন্বয়ের সামাজিক প্রভাবও আছে। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়তে পারে, যার প্রভাব পড়তে পারে পণ্য ও সেবার দামে। ফলে সরকারের সামনে একদিকে বিপিসির আর্থিক সক্ষমতা ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত রাখার প্রয়োজন, অন্যদিকে ভোক্তার ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ সীমিত রাখার চ্যালেঞ্জ।


এই বাস্তবতায় ২১ সেপ্টেম্বরের মূল্য সমন্বয়কে কয়েক মাস ধরে আন্তর্জাতিক বাজারের বাড়তি ব্যয় ও বিপিসির আর্থিক চাপ সামলানোর পর নেওয়া একটি সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা যায়। এখন গুরুত্বপূর্ণ হবে, আন্তর্জাতিক বাজারে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তার সুফল কত দ্রুত দেশের ভোক্তাদের কাছে পৌঁছায় এবং জ্বালানির মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ও নিয়মিত রাখা যায়।


লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক



  • সম্পাদক ও প্রকাশক: ইঞ্জিনিয়ার মো: রায়হানুল ইসলাম

  • উপদেষ্টাঃ মোঃ ইব্রাহীম হায়দার