essay writer
রাজশাহী | বৃহস্পতিবার | জানুয়ারী 18, 2018 | 5 মাঘ, 1425

নওগাঁয় জমির টপ সয়েল পুড়ছে ইটভাটার আগুনে : হুমকির মুখে পরিবেশ

নওগাঁয় জমির টপ সয়েল পুড়ছে ইটভাটার আগুনে ॥ হুমকির মুখে পরিবেশ

আব্দুর রউফ রিপন, নওগাঁ প্রতিনিধি ঃ নওগাঁ সদর উপজেলার কীর্ত্তিপুর গ্রামের মো: আলতাফ হোসেন বলেন আমি এখন প্রায়ই সময় অসুস্থ থাকি। শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ফুসকুনি বের হয়েছে। শ্বাস নিতেও কষ্ট হয়। আগে কখনো আমার এমন রোগ হয় নাই। ডাক্তার বলছেন ইট ভাটার ছাই ও ধোঁয়ার কারণে আমার এই রোগ হয়েছে। শুধু আমি নয় ইদানিং আমার আশেপাশের অনেক মানুষকেই এই সব রোগে আক্রান্ত হতে দেখছি। শুধু মানুষই নয় আগে আমার যে জমি থেকে ১৮-২০ মন সবজি পেতাম এখন জমির পার্শ্বে ইট ভাটা হওয়ার করণে ফলন ১০-১২ মনে কমে এসেছে।

জমির উর্বর শক্তিকে ইটভাটার আগুনে পোড়ানো হচ্ছে নির্বিচারে। নষ্ট করা হচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্যকে। তবুও নিরব ভ’মিকায় সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা। নীতিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কোন কিছু তোয়াক্কা না করে জমির উর্বর টপ সয়েল কেটে প্রতিনিয়তই ইট বানানো হচ্ছে নওগাঁর ইটভাটাগুলোতে। ভাটা মালিকরা সামান্য কিছু টাকা দিয়ে জমির মালিকের কাছ থেকে বিভিন্ন অজুহাতে জমির টপ সয়েল কেটে তোলায় জমির উৎপাদন ক্ষমতা দিন দিন হারিয়ে যেতে বসেছে। জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে নওগাঁয় বর্তমান ১৩৫ টি ইট ভাটার  মধ্যে মাত্র ৬৮ ইটভাটার বৈধ ছাড়পত্র রয়েছে। বাকিগুলো ম্যানেজের উপর চালিয়ে যাচ্ছে তাদের অবৈধ কার্যক্রম।

সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, নওগাঁয় গত বছরের ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে শতাধিক ইট ভাটা ইট প্রস্তুতির কাজ শুরু করেছে। জেলার ১১টি উপজেলার অধিকাংশ ইটভাটা নির্মাণ করা হয়েছে আবাসিক এলাকা ও আবাদি জমির আশেপাশে। আবার এসব ইটভাটায় ইট প্রস্তত করার জন্য আবাদি জমির উর্বর টপ সয়েল কেটে তোলা হচ্ছে। এতে করে জমিগুলো তার ফসল ফলানোর ক্ষমতা স্থায়ী ভাবে হারিয়ে ফেলছে।

নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মনোজিত কুমার মল্লিক বলেন, জমির টপ সয়েল ৬ ইঞ্চি পর্যন্ত হয়ে থাকে। টপ সয়েলে অনুযৌবিক এর ফলে জমির উর্বরতা নির্ভর করে থাকে। কেউ যদি জমির ৬ ইঞ্চি মাটি কেটে নেয় তাহলে জমির উর্বরতা কমে যাবে যার ফলে জমির ফলনও কম হবে। টপ সয়েল কাটার ফলে জমির স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে ৫-৭ বছর সময় লাগে। জমির টপ সয়েল না থাকলে মাটির জৈবশক্তি কমে গিয়ে  দীর্ঘ মেয়াদী  ক্ষতির মুখে পড়বে কৃষকরা। ভাটার মালিকরা সামন্য লাভে কৃষকদের কাছ থেকে জমির টপ সয়েল কিনে নিচ্ছে। যার ফলে কৃষকরা ফসল উৎপাদন করতে অতিরিক্ত মাত্রায় রাসায়নিক সার ব্যববহার করছে। যার প্রভাব পরিবেশের উপর পড়তে শুরু করেছে। তিনি আরো বলেন, অমরা ইতিমধ্যে মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের সচেতনতা মূলক প্রচারনা শুরু করেছি। এছাড়াও ভাটার ছাই এর কারণে আম ও কাঁঠালসহ বিভিন্ন ফলদ গাছের পাতা কুকড়ে যাচ্ছে যার ফলে ফলন কম হচ্ছে। পরিবেশ নীতিমালায় বলা হয়েছে উর্বর জমির মাটি ব্যবহার এবং আবাদ হয় এমন এলাকায় ভাটা করা যাবে না। কিন্ত নওগাঁর বেশির ভাগ ইটভাটা এসব নীতিমালার তোয়াক্কা করছে না। ভাটায় ব্যাপক হারে পোড়ানো হচ্ছে জ্বালানী কাঠ। এসব ইটভাটার ছাই উড়ে গাছের মড়কসহ ভাটা এলাকায় ফসলের ফলন ও কম হচ্ছে। এতে ক্ষতি হচ্ছে দীর্ঘ মেয়াদি।

নওগাঁ সদর উপজেলার বর্ষাইল গ্রামের কৃষক মতিউর রহমান বলেন, দশ কাঠা জমিতে সীম লাগিয়েছিলাম। কিন্ত পার্শ্বের ইটভাটা থাকায় তার ফলন বিপর্যয় হয়েছে । তিনি আরো বলেন, ডাব গাছে ভাটার ছাই পরার কারণে ডাবের গুটিও ঝড়ে যাচ্ছে।

রাণীনগর উপজেলার চকমনু গ্রামের কৃষক আফজাল হোসেন বলেন, প্রতি বছর আমার কয়েক বিঘা জমির ধান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে দুইটি ইট ভাটার কারণে। তারা যে ক্ষতিপূরণ দেয় তা খুবই কম। আমি একাধিক জায়গায় অভিযোগ দিয়েও কোন ফল পাই নাই।

সুরমা ব্রিকিস এর ম্যানেজার রিপন হোসেন বলেন, আমরা সাধারনত জমির টপ সয়েল কাটতে চাই না। অনেকটা বাধ্য হয়েই টপ সয়েল কাটি। দোঁয়াশ, এঁটেল ও বেলে মাটির সংমিশ্রনে ইট তৈরী করতে হয় এদের কোনটি কম হলে ইট শক্ত এবং মান সম্মত হবে না। আবার সব ধরনের মাটির সংমিশ্রন না থাকলে ইটের গুনাগুনও ঠিক থাকে না। জমির উপরিভাগের মাটি নিলে জমির ক্ষতি হয় কিনা এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কিছুটা জমির ক্ষতি হয়। ব্যবসা টিকে রাখার জন্য অনেকটা নিরুপাই হয়েই জমির টপ সয়েল কাটতে হচ্ছে।

সম্প্রতি নওগাঁর বদলগাছীতে ইটভাটা বন্ধের দাবীতে মানববন্ধন করেছে এলাকাবাসী। সেখানে দাবী জানানো হয়, স্থানীয় উজাল পুর গ্রামে দুটি ইটভাটা গড়ে তোলা হচ্ছে যার কোন অনুমোদন নেই। ফসলি জমি নষ্ট করে  ইট বানানো হচ্ছে তাই ভাটা দুটি বন্ধে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষন করেন এলাকাবাসী। মানববন্ধন শেষে উপজেলা নির্বহী অফিসারের কাছে ¯œারকলিপি প্রদান করে এলাকাবাসী।

বদলগাছী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাসুম আলী বেগ বলেন, আমি প্রশাসনের পক্ষ থেকে চেষ্টা করে যাচ্ছি নিয়ম বর্হিভ’ত কোন ইট ভাটা বদলগাছীতে না রাখার জন্য। জমির টপ সয়েল যেন ভাটার মালিকরা নষ্ট না করে সেই বিষয়ে আমি প্রশাসন পক্ষ থেকে প্রদক্ষেপ গ্রহন করবো।

এছাড়াও নওগাঁ সদর, রাণীনগর, আত্রাই, মান্দা, মহাদেবপুর, পতœীতলা, বদলগাছী, ধামুইরহাট উপজেলায় ইটভাটা গড়ে তোলা হচ্ছে আবাসিক এলাকায়। সেই সব স্থানেও জমির টপ সয়েল নষ্ট করে ইট বানানো হচ্ছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শক মুকুল হোসেন বলেন, নওগাঁতে পরিবেশ অধিদপ্তরের কোন অফিস নাই বগুড়া অফিস থেকে আমরা মনিটরিং করে থাকি। তাছাড়া আমাদের লোকবলের অভাব রয়েছে। সবে মাত্র ভাটা চালু হয়েছে। ইতিমধ্যে বৃষ্টির কারণে অনেক ইট নষ্ট হয়ে গেছে। আমরা যদি অভিযোগ পাই ইট ভাটার মালিকরা জমির টপ সয়েল অথবা পরিবেশের ক্ষতি করছে আমরা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহন করবো। তিনি আরো বলেন, ইতিমধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তর রাজশাহী বিভাগীয় কর্মকর্তা জনাব আশরাফুল জামান পরিচালক (উপ-সচিব) বগুড়ার নিশিন্দারা অফিস থেকে ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনার জন্য জেলা প্রশাসক বরাবর চিঠি দিয়েছেন। নওগাঁ জেলা প্রশাসকের অনুমতি পেলে আমরা ভ্রাম্যমান আদালতের কার্যক্রম শুরু করবো।

নওগাঁ জেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি আলহাজ্ব মোঃ রফিকুল ইসলাম বলেন, ইটভাটার ছাড়পত্রে বলা হয়েছে অনাবাদি জমি আর অনাবাসিক এলাকায় ইট ভাটা গড়ে তুলতে হবে। কিন্ত নওগাঁতে এমন জমি না পাওয়ার কারণে আবাদি জমিতে বাধ্য হয়ে আমরা ইট ভাটা তৈরী করছি। জমির টপ সয়েল কেটে ইট তৈরীর কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, আমরা জমির মালিককে টপ সয়েল কাটার জন্য নায্যমূল্য দিয়ে থাকি। শুধু মাত্র আমরা ইট তৈরীর জন্য জমির টপ সয়েল নিয়ে থাকি তা নয় দোঁয়াশ,এঁটেল ও বেলে মাটি দিয়েও ইট তৈরী করে থাকি। জমির মালিক যদি পুকুর করতে চায় তাহলে ২০,০০০-৪০,০০০ টাকা দিয়ে আমরা মাটি কেটে নেই। তিনি আরো বলেন, দেশের অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য ইটের বিকল্প নাই। আমরা চেষ্ট্া করছি নিয়মের মধ্যে থেকে ইট তৈরী করার। তিনি  পরিবেশের ক্ষতির জন্য শুধু মাত্র ইট ভাটা কে যেন দায়ী করা না হয় সে আহবান জানান।

নওগাঁয় জমির টপ সয়েল পুড়ছে ইটভাটার আগুনে ॥ হুমকির মুখে পরিবেশ

নওগাঁয় জমির টপ সয়েল পুড়ছে ইটভাটার আগুনে ॥ হুমকির মুখে পরিবেশ

নওগাঁর স্থানীয় সামাজিক সংগঠন একুশে পরিষদের সভাপতি ডি.এম.আব্দুল বারী বলেন, নওগাঁয় কোন পরিবেশ অধিদপ্তরে অফিস নেই। বগুড়া থেকে নজর দারী করে থাকে। তাই ভাটার মালিকরা জমির টপ সয়েল কেটে  ইট তৈরি করেই চলেছে। এভাবে চলতে থাকলে এমন একদিন আসবে যখন নওগাঁর জমিতে আর ফসল উৎপাদন সম্ভব হবে না। তিনি বলেন পরিবেশের অপূরনীয় ক্ষতি রোধে নওগাঁয় আর নুতন কোন ইটভাটার অনুমতি না দেওয়াই ভাল। পাশাপাশি নওগাঁতে পরিবেশ অধিদপ্তরের অফিস স্থাপনের জন্য প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষন করেন।

নওগাঁ সিভিল সার্জেন ডাঃ মোমিনুল হক বলেন, ইট ভাটা এলাকার অনেকেই চর্ম রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। তাছাড়াও হাপানি, চোখ জ্বালা, এ্যালার্জি জনিত দীর্ঘ মেয়াদী রোগ বেশী হচ্ছে ইট ভাটা এলাকায়। তিনি আরো বলেন, ভাটার ছাই এবং ধোঁয়ার কারণে শিশুরা  এ্যালার্জি জনিত রোগে বেশী আক্রান্ত হচ্ছে।

সদ্য বিদায়ী নওগাঁ জেলা প্রশাসক ড. আমিনুর রহমান বলেন, যে সব ভাটার মালিক পরিবেশের বিধান মানবে না তাদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রদক্ষেপ নেওয়া হবে। তাছাড়া জমির টপ সয়েল কেটে যেন ইট তৈরী করতে না পারে সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের কথা তিনি বলেন। প্রয়োজনে হলে  ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনার করে পরিবেশ আইনে মামলা করা হবে বলে তিনি জানান।

আব্দুর রউফ রিপন
নওগাঁ।
মোবা: ০১৭২৯-৩২০০১১
তাং ০৭-০১-১৮

print

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>